নিজস্ব প্রতিবেদক::
শেরপুরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলার ও তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪ কোটি টাকার সার কালোবাজারি ও পাচারের অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দায়েরকৃত মামলার বিষয়ে বাদী তথা তৎকালীন সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন কর্তৃক টেলিফোনে সরাসরি ধমক প্রদান ও ভীতি প্রদর্শনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও সুশীল সমাজের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কোটি কোটি টাকার রাসায়নিক সার কারসাজির মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় অপরাধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক চাপে ফেলার এই ঘটনা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ওপর গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
অনুসন্ধান ও সামাজিক মাধ্যমে ফাঁস হওয়া ফোনালাপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার সাবেক কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন সারের অবৈধ পাচার ও কালোবাজারির অভিযোগে ১৫ জন বিসিআইসি ডিলার এবং তাঁদের ৫ জন সহযোগীসহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। আইনগত এই কঠোর পদক্ষেপের পরই জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন উক্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অডিও রেকর্ডে জেলা প্রশাসককে উচ্চবাচ্যে বলতে শোনা যায় যে, জেলা সার মনিটরিং ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে জেলা প্রশাসককে না জানিয়ে কেন মামলা দায়ের করা হলো। তিনি কৃষি কর্মকর্তার বদলি ও কর্মস্থল ত্যাগ (রিলিজ) আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালককে (ডিডি) বিব্রত করে মামলা করা অনুচিত হয়েছে। এমনকি কথোপকথনের একপর্যায়ে উক্ত কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে ‘সুফি টাইপের মানুষ’ বলে উপহাস করা হয় এবং বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে শেরপুর ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
আইনি প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের এই ভিডিও ও অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন গণমাধ্যমের কাছে তাঁর অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কোটি টাকার সার কেলেঙ্কারির এই মামলাটি সরকারি ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন বা সরকারকে প্রশাসনিকভাবে বিব্রত করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কৃষি কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলেন। তবে কথোপকথনের সময় তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কল রেকর্ড করা এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা পেশাগত শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পরিপন্থী হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জেলা প্রশাসক। অন্যদিকে প্রশাসনিক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে থাকা তৎকালীন কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থা ও কৃষি উপকরণ মনিটরিং সংক্রান্ত প্রশাসনিক নীতিমালার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিসিআইসি ডিলারদের মাধ্যমে ভর্তুকিযুক্ত সার কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর রাষ্ট্রীয় বিধান রয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক দামে বিক্রি এবং সীমান্ত পার করে সার পাচারের মতো অনিয়ম বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার ও কালোবাজারি একটি মারাত্মক অসামিনযোগ্য অপরাধ। জেলা সার মনিটরিং কমিটি মূলত মনিটরিং ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকলেও, কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলে বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা ও মামলা দায়ের করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। কিন্তু এই ঘটনায় জেলা শীর্ষ কর্মকর্তার এমন আচরণ আইনি প্রক্রিয়ার স্বাধীন বাস্তবায়নকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৪ কোটি টাকার মতো বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার গায়েব হওয়া স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও সাধারণ কৃষকদের জীবনযাত্রার ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত। বিসিআইসি ডিলাররা বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়ে থেকে এ ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে বলে একাধিক সরকারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রশাসনিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এত বিশাল পরিমাণের সার পাচার হওয়া এবং পরবর্তীতে মামলা দায়েরকারী কর্মকর্তার ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির নজির মাঠ প্রশাসনের চরম অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে উন্মোচিত করে। উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যতিরেকে এই কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত আসল প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করা অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমনে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতির কার্যকর প্রয়োগ দেখতে হলে মামলা দায়েরকারী সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। শেরপুরে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত অডিও ফাঁস ও সার কেলেঙ্কারির ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক। সার পাচারের সাথে যুক্ত বিসিআইসি ডিলারদের চুক্তি বাতিল ও আইনি সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে কোনো বাধা প্রদান করা হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখাই এখন সময়ের দাবি। এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপ নিতে সংকুচিত বোধ করবেন, যা সামগ্রিক সুশাসনের পথকে অবরুদ্ধ করবে।
