ডি এস মাহফুজা হোসেন মিতা ::
আমাদের এই মাটিতে সাংবাদিকতা, সাহিত্য আর রাজনীতি-মনস্কতার যে গৌরবময় উত্তরাধিকার, তা এই জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা গন মাধ্যমের সদস্যদের প্রাণের সংগঠন প্রেস ক্লাবের সদস্য সাংবাদিক লেখকদেরই। আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পতাকাটা উঁচু রেখেছে প্রেস ক্লাব। ঢাকা, করাচি ও দিল্লিতে প্রায় একই সময়ে পত্তন বাংলাদেশের রাজধানী কেন্দ্রীক সাংবাদিকদের এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু দুর্বার ভাষা আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার টগবগে পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠানটি। জাতীয় প্রেস ক্লাব তার সংবিধানে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম, পেশাগত সর্বজনীনতা আর সাহিত্য-সংস্কৃতির উন্নয়নকে মহার্ঘ করে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বেগে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকে পরিচর্যা করে চলেছে।
আজ ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৫৪ সালের আজকের এই দিনে কতিপয় টগবগে তরুণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাণের এই সংগঠন জাতীয় প্রেস ক্লাব। এই প্রতিষ্ঠানের স্মরণে-উদযাপনে আজকে বহুদূর সময়ের ভেতরে চলে গেলে প্রথম প্রত্যক্ষে একটি সত্যই ধ্রুব তারার মতো আসে, তা হলো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে গণমুখী করার দুরূহ কর্তব্য নীরবেই পালন করে আসছে সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা। আজকের দিনে সবাই স্বীকার করেন যে ভাষা দুভাবে কাজ করে। একদিকে সে খবর দেয়, অন্যদিকে সে জাগিয়ে তোলে। তথ্য বা জ্ঞানের জগতে আমরা চাই স্পষ্ট ও সুসংলগ্ন ভাষা, যার আয়তন তার সংবাদের সঙ্গে খাপে-খাপে মিলে যাবে। কিন্তু গল্প, উপন্যাস বা কবিতার ভাষায় আমরা খুঁজি প্রভাব, যা তার ব্যাকরণ নির্দিষ্ট অর্থকে অতিক্রম করে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রেস ক্লাব সদস্যরা দুটি কাজই সমানভাবে সম্পাদন করেছেন। এ নজির উপমহাদেশে কেন, অনেক দেশেই বিরল।
সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ হিসেবে সত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। প্রতিথযশা সাংবাদিক বাসুদা জোশি বলেছেন, শ্রষ্ঠা আর সৃষ্টি দুয়েরই বিচরণ ক্ষেত্র হলো সংবাদ মাধ্যম। যা হলো মুলত: সাহিত্য। এই সাহিত্য আবার দুভাগে বিভক্ত সাহিত্য আর সংবাদ একবৃত্তে দুটিফুল। সাহিত্য হলো কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। যার উপজীব্যতা সব সময় থাকে টাটকা বা তাজা। আর সংবাদ পচনশীল বাসি হয়ে যায়। মুলত: সংবাদ আর সাহিত্যর মধ্যে প্রার্থক্য হলো সংবাদ পচনশীল পচে যায় আর সাহিত্য সবসময় টাটকা আর তাজা থাকে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘মানুষের জন্মভূমি তিনটি ১. পৃথিবী, ২. যে মাটিতে জন্ম, ৩. তার স্মৃতিলোক। এই স্মৃতিলোক প্রতিদিন বদল হয়, প্রতিদিন তাকে জন্ম দেয় নতুন ছাঁচে।’ আমাদের জীবন-স্মৃতির কতটা যে মিডিয়া বা গনমাধ্যম নির্ভর, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?
চাঁদে যে মানুষ নামল, নভোচারীরা হেঁটে বেড়াল, টিভি বা খবরের কাগজ সে ছবি মনে পুরে না দিলে আমাদের স্মৃতিটা তৈরি হতো কীভাবে? যখন গণজ্ঞাপন বা গণমাধ্যম ছিল না, মানুষ তার জীবনপ্রণালি, শৈলী আর জ্ঞানকে ধরে রাখত গুহার দেয়ালে চিত্রলিপিতে, মুখে মুখে বহমান উপদেশ-অনুশাসনে, সদা নির্মীয়মাণ মৌখিক ঐতিহ্যে।
মিডিয়া বা গণমাধ্যম অর্থাৎ সংবাদপত্র, টিভি, রেডিও, অনলাই বা নেট দুনিয়া, বই, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা নিজে স্বপ্ন দেখে অন্যকে স্বপ্ন দেখায়। ফ্রান্সের শীর্ঘ সংবাদপত্র ল্য মোন্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক উব্যের দ্য ব্যোভ মেরি একবার বলেছিলেন, মিডিয়া এমনই এক স্বপ্ন, যা আমরা সমবেতভাবে দেখি দিনের পর দিন। একজন বা একদল সাংবাদিক স্বপ্নিল তাড়না থেকে রিপোর্ট, ছবি, মন্তব্য, সম্পাদকীয়, ডকুমেন্টারি, কথিকা, উপস্থাপনা বা প্রতিস্থাপনায় একটি স্বপ্নকে বা মনের ছবিকেই সম্মিলিতভাবে শ্রোতা-দর্শক পাঠকের কাছে তুলে দেয়, যা পেয়ে উদ্দিষ্টরাও এক ধরনের স্বপ্নে বা দুঃস্বপ্নে নিক্ষিপ্ত হয়।
কিন্তু স্বপ্নের মালিকানা কি শুধু সাংবাদিকতারই? সাহিত্যেরও একটা স্বপ্ন আছে, যা রোজ দিনজুড়ে বা রাতজুড়ে তৈরি হয় না। তবে এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ, সূক্ষ্ম, অলক্ষ, চোরাগোপ্তা ধারায় তা ছেয়ে থাকে আমাদের জীবনে। এর প্রচার অনেক সীমিত, অনেক নির্জন কিন্তু এর দ্বারা অঙ্কুরিত স্বপ্নের আয়তন অনেক বেশি।
এটা ঠিক, সংবাদের সহস্র তথ্যে নিজেদের জীবনের কিছু না কিছু প্রত্যহ দেখে চলেছি। অসংখ্য কিছু জানছি, যা জ্ঞানে ধারণ করছি না। ধারণায় সংবদ্ধ করছি না। সারা দুনিয়ার শেয়ারবাজারে মুনাফা শিকারি জর্জ সরোজ ‘Age of Fallibility’ নামক গ্রন্থে জানান দিয়েছেন Recent discoveries in cognitive science have shown that the information we gather has to be processed before it can enter our consciousness. That is because information is received on a bandwidth of more than a million. But consciousness operates on a bandwidth of about forty.
রিপোর্টকে তো আমরা জানি Literature in hurry বা ত্বরিত সাহিত্য বলে। এতে স্বপ্ন দেখা বা দেখানো ছাড়াও সমাজ জীবনে হস্তক্ষেপের অভিমুখীনতাও আছে। সাহিত্যে ত্বরিত্ব হস্তক্ষেপের সুযোগ বিশেষ হয়তো নেই কিন্তু তার জন্মই, জীবন, সমাজ, ঘটনা ও ইতিহাসকে একেবারে নিজের মতো করে ভেঙে গড়ে একেবারে এক সমান্তরাল বিকল্প সত্যে নির্মিত করায়।
বলা হয়, সাংবাদিকের ভাষা ও সাহিত্যিকের ভাষা হবে আলাদা। প্রথমটি হবে চাঁছাছোলা, নিরাভরণ, নিরপেক্ষ আর সাহিত্যিক তার ভাষায় নেবেন শব্দ, কল্পনা ও মূর্ছনার স্বাধীনতা। কিন্তু বিষয়ের প্রয়োজনে ভাষাকে ঝংকারময় করতে কোনো আপত্তি আছে কি ?
না কোন আপত্তি নেই। বিদ্রোহী কবি নজরুলের সাংবাদিকতার ভাষাকে স্মরণ করুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ভাষার কী অদ্ভুত মিশেল! তার সাংবাদিক জীবন তো এক অগ্নিযুগের কাহিনি। ১৯২২ সালে প্রকাশ করেন ‘ধূমকেতু পত্রিকা’। নজরুলের সম্পাদকীয় রচনার ভাষা ছিল তার কবিতার মতোই লাবণ্যময় এবং তেজোদৃপ্ত। ১৯২২-এর তেসরা নভেম্বর ‘ধূমকেতু’তে ‘নিশান-বরদার’ নামে একটি সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘আমাদের বিজয় পতাকা তুলে ধরার জন্য এসো সৈনিক। পতাকার রঙ হবে লাল, তাকে রঙ করতে হবে খুন দিয়ে। বল আমরা পেছোব না। বল আমরা সিংহশাবক আমরা খুন দেখে ভয় পাই না। বল আমি আছি আমি পুরুষোত্তম জয়। বল মাভৈ মাভৈ জয় সত্যের জয়।’
তথ্যকে যুক্তির ন্যায্যতা দিয়ে বিন্যস্ত করা সাংবাদিকতার ধর্ম। পাঠক ধরেই নেন, সাংবাদিক যা বর্ণনা করছেন, তা ষোলোআনা বাস্তব। কিন্তু বাস্তবকে বাস্তবতা দিয়ে লেখা ক্যামেরার ভিডিও ছবিতে আর কল্পনাকে বাস্তব করে লেখার বা তুলে ধরার চেয়ে কোনোভাবেই সহজ কাজ নয়। বরং বাস্তবের বর্ণনায় ভাষার অবাস্তবিক হয়ে পড়ার আশঙ্কাগুলো। খারাপ প্রতিবেদক রিপোর্টে অহেতুক সাহিত্য ফলানোর চেষ্টা করে। তবে আমরা ভুলে যেন না যায় আড়াই ঘন্টার চলচ্চিত্র কিংবা ৫০০ পাতার উপন্যাসের চেয়ে ২০০বা দেড়শ শব্দের রিপোর্ট বা দেড় মিনিট ব্যপ্তির টেলিভিশন রিপোর্ট কিন্তু কোন অংশেই কম গুরুত্ববহ নয়।
ভাষা, সাংবাদিকতা, সাহিত্যের উল্লেখে আমাদের জাতিসৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণের ধারায় আমাদের সাংবাদিক-সাহিত্যিকরা জাতীয় প্রেস ক্লাব নামের এক শীতল ছায়ায় কত বড় সোনার খনি রেখে গেছেন, তার উল্লেখ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্যে উত্তরণ। রিপোর্টারের সাংবাদিকতা দিয়ে গল্প বা উপন্যাস। এ সূত্রে Literary Journalism বলে নতুন এক শাখার জন্ম।
সে থেকেই সাংবাদিকতা প্রখরভাবে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম অভিমুখী। জাতীয় প্রেস ক্লাবের গঠনতন্ত্রে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের কথাটা এসেছে সম্ভবত ওইবোধ থেকেই। রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিকরা পত্রিকা প্রকাশ ও সক্রিয় সাংবাদিকতাকে মুক্তি-সংগ্রামের প্রধান বাহন হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন। ইংরেজরাও সে জন্য সংবাদপত্র দমনে খড়গ হেনেছে বারবার। ১৮৯৮-এর কুখ্যাত সিডিশন বিল পাস হওয়ার আগেরদিন কলকাতার টাউন হলে প্রতিবাদ সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ প্রকাশের অধিকারকে পরশাসিত জাতির আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার একটি অপরিহার্য অবলম্বন বলে ঘোষণা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাংবাদিকতা শুরু ১৮৯১ সালে প্রকাশিত ‘হিতবাদী’ পত্রিকা দিয়ে। ছিলেন সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক। মৌলবি আবুল কাশেম ফজলুল হকের ‘নবযুগ’ পত্রিকায় নজরুল সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২২ সালে বের করেন ‘ধূমকেতু’। প্রথম ও বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী দুই দশকে বাংলা সংবাদপত্র তিনটি ধারায় প্রকাশিত হতে থাকে। একপক্ষ কংগ্রেস সমর্থক, দ্বিতীয়টি মুসলিম লীগের নীতির অনুগামী। তৃতীয় ধারাটি ছিল বামপন্থিদের। তখন সাংবাদিকতার মূল প্রেরণা ছিল জাতীয় মুক্তি।
আঠারো শতকের শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে পর্তুগিজ ও ইংরেজ পাদ্রিদের উদ্যোগে কলের ছাপাখানা বা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। ১৮৫০-এর দিকে ঢাকায় প্রথম প্রেস বসে। ১৮৬০ সালে বাবুবাজারে স্থাপিত হয় ‘বাঙালা যন্ত্র’। তখন থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা থেকে প্রায় ৬০টি নানা ধরনের পত্রিকা বেরোত। বিংশ শতাব্দীর বিশ দশকে কিংবা তারও আগে মুসলমানদের উদ্যোগে যেসব সাময়িকী প্রকাশিত হয়, তার অধিকাংশেরই প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাংবাদিকরা। যেমন
বিখ্যাত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক ছিলেন চারণকবি ও সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ,‘আল-এসলাম’-এর সম্পাদক ছিলেন মওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মোসলেম ভারত-এর সম্পাদক ছিলেন শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক, ‘বঙ্গীয় মুসলমান পত্রিকা’র সম্পাদক ছিলেন ভোলার কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ও বরেণ্য জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আজাদ পত্রিকার সম্পাদক (১৯৪০-৬০) প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের বয়ানে পাওয়া যায়, মুন্সী মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দীন আহমদ ও শেখ আবদুর রহীম নিঃসন্দেহে বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতার অগ্রপথিক, কিন্তু সংবাদপত্রকে সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন, যারা তার মধ্যে ‘মুসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মওলবী মুজিবুর রহমান অন্যতম।
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ। তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সুপণ্ডিত। মাসিক মোহাম্মদীরও তিনি ছিলেন প্রকাশক-সম্পাদক। তার রচিত ‘মোস্তফা চরিত’ এবং ‘তাফসীরুল কোরআন’ বলিষ্ঠ গদ্যেরই পরিচায়ক। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে ১৯৬৪ সালে বের হওয়া ঐতিহাসিক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন আরেক সাংবাদিক-সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর প্রথম ও সফল সম্পাদক ছিলেন এবং ৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে এমএলএশিপ ত্যাগ করেন। প্রথম শহীদ মিনারেরও উদ্বোধন তার হাতে। তার অনুবাদ সাহিত্য এখনো অদ্বিতীয় বলে বিবেচিত।
দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ তৎকালিন সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সৃষ্টির মতো মিথস্কিয়া সৃষ্টির কারিগর।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রাম, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রতিটি পর্বেই প্রেস ক্লাব সদস্যরা বীরোচিত ভূমিকা পালন করেছেন। পাক-হানাদার বাহিনী এতই ক্রুদ্ধ ছিল যে, ২৫ মার্চের কালরাতে প্রেস ক্লাবে গোলাবর্ষণসহ কয়েকটি পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। ৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর তারা ও তাদের সহযোগীরা শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের গুম করে মেরেছিল।
পঞ্চাশের দশকে যেসব সাংবাদিক সাহিত্যচর্চা করতেন এবং যেসব সাহিত্যিক সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন, তারা দুটি পত্রিকাকে ভিত্তি করে এগিয়েছিলেন। ‘আজাদ’ ও ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা অফিসে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি এবং ‘সওগাত’ অফিসে বামধারার পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ। এছাড়াও এই ধারায় ছিল দৈনিক পাকিস্তান যা স্বাধীনতা পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে পত্রিকা। আর দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক একতা, দৈনিক খবর ছিল বাম ধারার সাংবাদিকদের মিলন মেলার স্থান। সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও সাহিত্যিক-সাংবাদিক যে তালিকা করা হোক না কেন, ত্রুটি থাকার আশংকা বেশি। পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন, ফয়েজ আহমদ দুহাতে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য করতেন। ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ বইটি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের এক চমৎকার সমন্বয়। বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। ‘সত্য বাবু মারা গেছেন’-এ বইটি তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবকে উৎসর্গ করেছেন। ক্লাবের আজীবন সদস্য নির্মল সেনের ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’, তোয়াব খানের ‘ফিরে দেখা আজ’ এবং কাল’, আতাউস সামাদের ‘এ কালের বয়ান’ আমাদের গর্বিত করে। ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বা ‘ফুড কনফারেন্স’খ্যাত আবুল মনসুর আহমদ, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, মুজীবুর রহমান খাঁ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, মোহাম্মদ ওয়ালীউলাহ, আহসান হাবীব, আবদুর রশিদ ওয়াসেকপুরী, আবদুল গণি হাজারী, এ বি এম মুসা, শামসুর রাহমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, গোলাম মোস্তফা, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, দাউদ খান মজলিশ, ওয়াহিদুল হক, ওবায়েদ উল হক, এ জেড এম এনায়েতুল্লাহ খান, সানাউল্লাহ নূরী, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, রাহাত খান, অধ্যাপক আবদুল গফুর, সন্তোষ গুপ্ত, আখতার উল আলম, হাসান হাফিজুর রহমান, লায়লা সামাদ, মাফরুহা চৌধুরী, আহমেদ হুমায়ুন, আফলাতুন, রোকনুজ্জামান খান, এম আর আখতার মুকুল, শহীদ সাবের, আনিস চৌধুরী, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, রিয়াজুদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ ফজলুল করিম, কাজী মাসুম, সাযযাদ কাদির, মাহফুজউল্লাহ, রফিক আজাদ, শফিকুল আজিজ মুকুল, জাফর আলম, হেলাল হাফিজ, মাহমুদ শফিক, ইমদাদুল হক মিলন, সোহরাব হাসান, ইউসুফ পাশা, আবু কায়সার, মইনুল আহসান সাবের, মুস্তফা মজিদ, হাসান হাফিজ, আব্দুল হাই সিকদার, ইরাজ আহম্মেদ, আরিফ হোসেন, অমিতাভ কাঞ্চন প্রমুখ। প্রত্যেকেই জাতীয়ভাবে সুপরিচিত।
সম্পাদক আবুল আসাদ, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান, মাহমুদুর রহমান, নুরুল কবীর প্রমুখের বই বহুল পঠিত।
১৯৬৪ সালের নভেম্বর প্রকাশিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় একসঙ্গে বহু সাংবাদিক-সাহিত্যিকের সমাবেশ ঘটে। বেশি দিন হয়নি দুর্দান্ত প্রাণশক্তিতে সচল-সক্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, ফজল শাহাবুদ্দীন, খোন্দকার আলী আশরাফ, সালেহ চৌধুরী প্রমুখ। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য সাংবাদিক-লেখক সদস্য এখনো দুহাতে গদ্য ও পদ্যচর্চা করে চলছেন। বই বের হচ্ছে ফি বছর, কারো কারো বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। আর কোনো প্রতিষ্ঠান আছে কি না জাতীয় প্রেস ক্লাবে এখনো কবি-সাংবাদিকরা কবিতাপাঠের আসরে বসেন; ‘কবিতাপত্র’ নামে একটি নিয়মিত প্রকাশনা আছে। তবে লেখালেখির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মানের বিচার তো পাঠক আর দর্শকদের।
সাংবাদিকতার প্রণালি দিয়ে সাহিত্য রচনার দৃষ্টান্ত কিন্তু ক্রমেই ভারী হচ্ছে। সাংবাদিকতা আধুনিক নভেলের একটা বিশেষ গুণ। ১৯৫৯ সালের ১৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস রাজ্যের ছোট্ট হলকুম্ব শহরে ক্লাস্টার পরিবারের চারজনকে খুন করা হলো মুখের কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে গুলি করে। নিউ ইয়র্কের পত্রিকার জন্য ফিচার রিপোর্ট করতে সেখানে যান ট্রুম্যান কাপোটি নামে এক সাংবাদিক। চার বছর ধরে ডিটেল অনুসন্ধানে নোট নিতে নিতে তিনি দেখলেন, একটা উপন্যাস দাঁড়িয়ে গেছে। প্রকাশিত হলো বিশ্বের প্রথম non fiction নভেল ‘In Cold blood’। প্রেসিডেন্ট কেনেডির মৃত্যুতে উইলয়াম মাঞ্চস্টারের লেখা ‘ডেথ অব আ প্রেসিডেন্ট’ (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যার সফল অনুবাদ করেছেন) বইটি হত্যাকাণ্ডের সূক্ষ্ম, সাংবাদিক পুনর্গঠনে প্রায় সাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। কাপোটির এই নির্মাণ ধারাকে সমালোচনা করলেও নর্মান মেইলার দেড় দশক পর জেলে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গড়ে তোলেন এক খুনির জীবন উপন্যাস ‘দ্য এগজিকিউশনার্স সং’।
নোবেল বিজয়ী গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘স্টোরি অব এ কিডন্যাপিং’ সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের স্বপ্নকে একাকার করে দিয়েছে। ট্রয় যুদ্ধের অন্তত তিন-চারশ বছর পর হোমার তার ‘ইলিয়াড’ লিখেছেন, জনশ্রুতি, লোকগাথা, কথা-উপকথার সামুদ্রিক তোড় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। মধ্য ষাট দশকে টম উলফ ‘নতুন সাংবাদিকতা’ বলে ঝড় তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু যথার্থ তত্ত্ব সমর্থনের অভাবে তা ভেস্তে যায়। উনিশ শতকে মার্ক টোয়েন, বিশ শতকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জন স্টেইনবেক বর্ণনাধর্মী লেখনীতে আশ্রয় নেন। ট্রুম্যান কাপোটি, নর্মান মেইলার, টম উলফ তা অনুসরণ করেন। এটাই ক্রমে Literary journalism বা সাহিত্য-সাংবাদিকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সংবাদ মাধ্যমে টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়া নতুন ধারার সাংবাদিকতা সৃষ্টি করেছে। ভিডিও ছবির সংবাদ যখন মানুষের সংবাদ দেখার জনআকাংখা সৃষ্টি করছে। ঠিক তখন আটিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে ফেক সংবাদ তৈরির কারিগরি দক্ষতা সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
যদিও খ্যাতিমান টেলিভিশন ও বেতার সাংবাদিক সাইমন ড্রিংক, মার্ক টালি কিংবা কিশ্চিয়ান আমানপুর মনে করেন, ফেক বা ভুল তথ্যের সংবাদ যাচাই বাছাই করার যোগ্যতা পাঠক বা দর্শকের। এখানে সাংবাদিককে প্রশ্নবিদ্ধ করার বা প্রশ্নবিদ্ধ হবার কোন কারণ নেই। সাংবাদিক বা সংবাদিকতা নয়, ফেক সংবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ভালো ড্রাইভার গাড়িকে গন্তব্যে নিয়ে যাবে আর ড্রাইভার ভালো না হলে , গাড়ি দুঘটনার শিকার হবে। এটাই নিয়ম।
লিটারিরি জার্নালিস্ট সুসান অরলিনকে ‘এসকোয়ার’ ম্যাগাজিন দায়িত্ব দিয়েছিল আমেরিকার দশ বছর বালকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য। তোলপাড় করা ‘হোম এলোন’ ছবিতে সেই দশ বছরের নায়কের কাণ্ডকারখানা আসলে মার্কিন বালকদের আচরণের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ কি না তা দেখাই ছিল মূল্য উদ্দেশ্য। সুসান এমন একটি বালককে বাছাই করে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ছয়টি মাস কাটালেন। তারপর বেরোল তার সেই ঐতিহাসিক রিপোর্ট The American man at age ten, বাংলাদেশের অসংখ্য সাংবাদিকতার নির্দশণ আছে যা আইনের শাসনপ্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা রেখেছে।
এরশাদ শিকদার, মুনির খুকুসহ অসংখ্যা অপরাধীদের মুখোশ খুলে দিয়েছে বাংলাদেশের গনমাধ্যম। তৎকালিন তুখোড় সাংবাদিকরা এই তথ্যগুলোকে জনসন্মুখে তুলে ধরে অপরাধিদের আইনের কাঠগড়ায় হাজির করেছিল।
দৈনিক মুক্ত বাংলা পত্রিকার সম্পাদক বিশিষ্ট টেলিভিশন সাংবাদিক আরিফ হোসেন ২০১২ সালে এটিএন বাংলা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে "এটিএন বাংলা", অনলাইন টেলিভিশন "abc tv" ও তার সম্পাদিত "চলমান দেশ" পত্রিকায় অর্থনৈতিক দুর্নীতির ওপর বিশেষ রিপোর্ট করে "হলমার্ক কেলেংকারি" উদঘাটন করেছিলেন।
ভুমিদস্যুদের দখল থেকে খাল নদী, জলাশয় দখলের বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সাল থেকে সিরিজ রিপোর্টিং করেছিলেন। যে কারলে খাল, নদী, জণাশয় উদ্ধারে সরকার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছিল।
বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণতৎপরতা সঠিক ভাবে পরিচালনা ও অপরাধ দমনে কঠোর হবার ক্ষেত্রে টেলিভিশন ও প্রিন্ট পত্রিকার মাধ্যমের সাংবাদিকরা অনন্য ভুমিকা রেখে আসছে।
সাম্প্রতিক ডিজিট্যাল প্লাটফরম বা সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল জার্নালিজম বা মুঠোফোন সাংবাদিকতার বিপ্লবে ধরা পড়েছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মুরাদ, জামায়াত এমপি নজরুল, হালে রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্র উচ্ছেদ, নেতাদের চাদবাজি আর সেলিব্রিটির নানান প্রতারনা। হালে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকেও পদ ছাড়তে হয়েছে এই ডিজিট্যাল প্লাটফরমের কারণে। সুস্থধারার সাংবাদিকতা এআই যুগেও তাদের যোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে।
এরশাদ সরকারের সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে সাংবাদিক শফিক রেহমান এর "যায় যায় দিন" পত্রিকায় প্রকাশিত বিখ্যাত রিপোর্ট "সংসদের ত্রিশসেট অলংকার" সেই সময় হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল এবং ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। ক্ষিপ্ত হয়ে এরশাদ সরকার "যায় যায় দিন" পত্রিকার প্রকাশনাবন্ধ করে দিয়ে ছিলেন।
এরকম বহু সুখ স্মৃতির পাশাপাশি অনেক সংকট ও চড়াই উৎড়াই পেড়ুতে হয়েছে এদেশের সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার।
এবার ফিরে তাকাই আজকের সংকটের দিকে। সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা এই দুই ব্রতের সঙ্গে জাতীয় মুক্তির পাগল করা আকাঙ্ক্ষার যোগফলে আমরা তিনটি শতাব্দী তথ্য, জ্ঞান ও উপলব্ধির যে সোনার খনি গড়েছি, তা কি শুধু স্মৃতি হয়েই থাকবে? দীনতার মধ্যে হলেও ডিজিট্যাল মাধ্যম বা টেলিভিশন, রেডিওর পাশাপাশি সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্দীপনা, সাধারণ মানুষকে তার উদ্দিষ্ট করে তোলা, লেখালেখির প্রবল উন্মাদনা, জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের একেকটি পর্যায়কে পরিপুষ্ট করে তোলার চেতনা আজ আমরা হারাতে বসেছি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের পরিসরে সদস্য লেখকরা এখনো কায়ক্লেশের মঞ্চে ওই সমুজ্জ্বল উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা, বিশ্বায়ন, বাজার অর্থনীতি, খোলাবাজার, খোলা সমাজ, খোলা মানসিকতাকে বীজমন্ত্র করে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যমে ধামাকা বা রুচিভ্রংশের যে মচ্ছব চলছে, তাতে করে ব্রত এখন বৃত্তিতে, মূলধারা এখন শীর্ণ উপধারায় পর্যবসিত হয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতরকার শক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেষ্টা ছিল আগাগোড়াই। কিন্তু সংগ্রামটা অনুচ্চারিত, সময়টা যেন নৈরাজ্যবাদী।
দলদাসগিরিই এখন যেন আমাদের একমাত্র ব্রত। রাজনীতি ছাড়া যেন রুজি নেই। প্রেস ক্লাব বা ইউনিয়ন হাওয়া বুঝে পাল ওড়ায়। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান তার রাজনীতির সহযোগি হিসেবে সাংবাদিকতাকে তুলে এনেছিলেন। জাতীয় সংকট কাটানোর দিক নির্দেশনা তিনি গনমাধ্যমের সমালোচনা ও সংবাদ থেকে তুলে আনতেন। তার সময়ের সাংবাদিকরা ছিলেন সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধু শুধু সাংবাদিকদের নয়, তাদের প্রাণের সংগঠন জাতীয় প্রেসক্লাবকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন।
স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং দুই স্বৈরাচারকে (১৯৮২-৯০,২০০৭-২৪) পদদলিত করার অসামান্য রেকর্ডধারী দেশনেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতীয় প্রেস ক্লাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। ফ্যাসিবাদের তোতমায় জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় প্রেসক্লাবকে জাতীয় মর্যাদা ও আন্তজার্তিক মানে তুলে আনতে একটি বহুতল মিডিয়া সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেন্যুফেষ্টোতেও তুলে ধরা হয়েছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাব নেতৃত্বের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক কল্যান ফান্ড প্রবর্তণ করছিলেন। এভাবে যুগে যুগে রাষ্ট্রনায়করা সাংবাদিকদের মুল্যায়ণ করেছেন। একই সাথে সাংবাদিকদের সংগঠণকে মর্যাদার আসন দিয়েছেন।
আর বিভিন্ন আন্দোলনে জাতীয় প্রেস ক্লাব হলো আন্দোলনের পাদপীঠ। এই সংগঠন সাংবাদিকদের প্রাণের মিলনমেলায় পরিণত হতো না শুধু, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলনের বিশাল সমুদ্রে প্রেস ক্লাব ছিল এক সময় দল-মত-নির্বিশেষে গণতন্ত্রের ছোট্ট দ্বীপ বা সুতিকাগার। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব আজ আমাদের দুয়ারে। সংবাদপত্র আজ বিশ্বমুখীন। প্রিন্ট ভার্ষণের পত্রিকাও এখন অনলাইল প্লাট ফরমে ডিজিট্যাল ভার্ষনে এসেছে। মোবাইলে বাটন টিপে সোশ্যাল প্লাটফরমে কিংবা রিমোটের বাটনটিপে পত্রিকার, অনলাইনের কিংবা টিভির চ্যানেল ঘোরালেই বিচিত্র ভুবনের কত মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। এসবই অপরিহার্যভাবে আমাদের জীবনকে বৈচিত্র্যময় সম্ভাবনার মুখোমুখি করে। আবার আমরা তথ্য প্লাবিতও বটে। কিন্তু তারপরও খেদ থেকে যায়, বিশ্বভুবন পরিক্রমা করতে গিয়ে ‘একটি ঘাসের শিষের ওপর একটি শিশির বিন্দু’, যা আমাদের ঘরের কিনারেই, তা বুঝি দেখা হলো না। অহোরাত্র পণ্যের প্রলোভন বিস্তারে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া, স্পন্সরশিপ শিশুর প্রত্যুষ থেকে বৃদ্ধের জরা পর্যন্ত বেঁধে ফেলেছে তার খোয়াড়ের এলাকায়।
গনমাধ্যম বা প্রেসের ওপর নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খড়গ, রাজনৈতিক রক্তচক্ষু, সাংবাদিক পীড়ন আছে, চলবে।
বন্ধ হয়েছে পত্রিকা, টেভিভিশন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে একটি পত্রিকা প্রকাশনায় রেখে সব পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছিল।
বিএনপির শাসন আমলে ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার।
১/১১ সরকারের আমলে সিএসবি নামের নিউজ চ্যানেল বন্ধ করেছিল সরকার।
আওয়ামী লীগের আমলে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার।
সাংবাদিক-সাহিত্যিকরা সুঠাম জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হয়েও চলবেন। কিন্তু হালে মিডিয়ায় পুঁজির প্রাচুর্যের সংকেত, তথ্য অধিকার, সর্বোপরি জাতিসৃজনের অফুরান সম্ভাবনাকে যদি কাজে লাগাই, আমাদের সেই ব্রতের বা সোনালি অতীতের উজ্জীবন ঘটাই হয়তো অনেকখানি এগোতে পারব। কিন্তু তার জন্য চাই আলোকিত হৃদয়।
অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও সমাজ নীতিতে সবাই বলছেন ‘বিগ পুশ’-এর কথা। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও জাতীয় মুক্তির প্রত্যাশা মাইলফলক হিসেবে কিন্তু এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু জাতীয় মনস্কতায় সোনালি অতীতটা উজ্জীবনের পথনির্দেশক না হয়ে স্রেফ আন্দোলন, হই-চইয়ের উৎস হলে জাতি এগোবে না। আর প্রেস ক্লাবকেও ফিরে আসতে হবে নিজস্ব গঠনতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের সাধনায়। নাহলে পুরোনো ঐতিহ্য ঐশ্বয্য হারিয়ে যাবে। যা আমাদের কারো কামৗ নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও দৈনিক মুক্ত বাংলা পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক।
