কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাতের অন্ধকারে দু-একটি জায়গায় ককটেলবাজি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলেও জানান তিনি।
আজ রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিবাদী, মাফিয়া শক্তি ও নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তথাকথিত কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। আজ দলটির দেওয়া ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাতের অন্ধকারে দু-একটি জায়গায় ককটেলবাজি করা হয়েছে।’
হাইকোর্টের ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনায়ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া চালক ও হেলপারবিহীন অবস্থায় বিভিন্ন জায়গায় পার্ক করে রাখা পরিত্যক্ত কিছু বাসকে রাতে লক্ষ্য করে দু-একটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। শনাক্ত হওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। তাঁর সফরের আগে এক সপ্তাহ ধরে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে—এমন একটি পরিস্থিতি উপস্থাপনের চেষ্টা কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় অংশগ্রহণ প্রতিবছর একবার হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।
আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চের কর্মসূচি এসব ঘটনার অনেক আগে ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের কর্মসূচিতে আরও দুটি লংমার্চের কথা রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ককটেলবাজি হচ্ছে। আসলে এর সঙ্গে বিরোধী দলের কর্মসূচির সম্পর্ক নেই।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি দুই বছর ধরেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে আসছে এবং বর্তমান ঘটনাগুলো তারই ধারাবাহিকতা।
বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কথা বলবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে এ পর্যন্ত সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের জন্য চুক্তি অনুযায়ী ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সরকার অনুসরণ করছে। ভারত সরকার অনুরোধপত্র আমলে নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
গত শুক্রবার তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২৩ জনকে আটক বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু লোক নামাজ শেষ হওয়ার পরও বসে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এ ধরনের তৎপরতার তথ্য থাকায় তাদের আটক করা হয়। তাঁদের সংখ্যা প্রায় ২৩ জন।
আটক ব্যক্তিদের টেলিফোন ফরেনসিক পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁদের পার্শ্ববর্তী থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রায় ১১ জনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ বা টেলিফোন ফরেনসিকে সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে অভিভাবক ও সমাজের মুরব্বিদের ডেকে ১১ জনকে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের ফোনের ফরেনসিক প্রতিবেদন ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে তাঁরা ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন করতে চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতার জন্য সংগঠিত হতে চেয়েছিলেন।
উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। বাকি তথ্য জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সমাধানের জন্য সংসদে আলোচনার যে দাবি জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার দীর্ঘ আলোচনা করেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধী দল একটি কমিটি করতে চেয়েছিল। সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি পরামর্শ দিয়েছে। বিষয়টি সেখানেই শেষ হওয়া উচিত ছিল।
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো কারণে সৃষ্ট নয় উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি, তেল ও গ্যাসের মূল্য যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধি খুবই কম হয়েছে। পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে প্রায় দ্বিগুণ দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বিএনপি সরকার দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও এসব কেন্দ্রের জন্য গ্যাসের সংস্থান করা হয়নি। কোথা থেকে গ্যাস আসবে, সেটিও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও সমস্যা রয়েছে।
গ্যাসের কারণে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় চালু করা যাচ্ছে না, তার পেছনে আগের সরকারের বিদেশনির্ভরতাকে দায়ী করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। বাংলাদেশে স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাসের মজুত থাকা সত্ত্বেও সেগুলো অনুসন্ধানে আগের সরকার পদক্ষেপ নেয়নি।
বর্তমান সরকার গত ছয় মাসে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রায় ১৫০টি কূপ খননের কাজ চলছে। দেশীয় সম্পদ আহরণের চেষ্টা না করে বিদেশনির্ভরতার কারণে গ্যাস খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই পুঞ্জীভূত সমস্যাই এখন সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে না অবনতি হয়েছে, তা নির্ভর করবে সংঘটিত অপরাধের পর সরকার ও পুলিশ বিভাগের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। বিচারপ্রক্রিয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপ নেই দাবি করে তিনি বলেন, সরকার সহযোগিতা করে। বিচারিক কার্যক্রম বিচার বিভাগ পরিচালনা করে। বিচার বিভাগ স্বাধীন।
এ ধরনের অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ হবে এবং দেশে বিচারের সংস্কৃতি ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ উৎসাহিত হয়