এলিজা বিনতে এলাহী ::
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারীর ৪৫তম বার্ষিকী।
বাংলাদেশের ওপেন হার্ট সার্জারির সূচনালগ্ন — ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১ ! আজকের এই দিনে, ৪৫ বছর আগে, বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। আর সেই অধ্যায়ের পথিকৃৎ ছিলেন আমাদের পিতা — প্রফেসর ইমিরিটাস ডা. এম নবী আলম খান।
আব্বা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করার পর লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখান থেকে অর্জন করেন এফসিপিএস ও এফআরসিএস , পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফএসিএস ফেলোশিপ। দীর্ঘ ৮ বছর গ্রেট ব্রিটেনে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত থাকার পর ১৯৮০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। আর দেশে ফেরার এক বছরের মাথায়, জাপান ও বাংলাদেশের একটি যৌথ মেডিকেল টিম মিলে সম্পন্ন করে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারি। এই সফল অস্ত্রোপচারে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের আরেকজন সহকর্মী, অধ্যাপক এস আর খান।
পরবর্তী জীবনে আব্বা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিওভাসকুলার সার্জারি বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে শল্য চিকিৎসায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে স্বর্ণপদক এবং সম্মানসূচক “ইমিরিটাস” উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি শায়িত আছেন ঢাকার বনানী কবরস্থানে।
এখন আসি সেই ঐতিহাসিক দিনের কথায় —
১৯৮১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, রাজধানী ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে সম্পন্ন হয় বাংলাদেশের প্রথম ওপেন হার্ট অপারেশন। সেই সময়ে বাংলাদেশে হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য শুধুমাত্র স্টেথোস্কোপ, ইসিজি আর এক্স-রে মেশিনই ছিল প্রধান ভরসা — আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় কিছুই ছিল না বললেই চলে। এমন এক সীমাবদ্ধ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ চিকিৎসক দল যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে ছিল যুগান্তকারী।
সেদিনের সেই একটি অপারেশন শুধু একজন রোগীর জীবন বাঁচায়নি — বাংলাদেশে কার্ডিয়াক সার্জারির ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আজ, ৪৫ বছর পরে, বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার সফল হৃদ অস্ত্রোপচার হয়, দেশ এই ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ — আর এই দীর্ঘ যাত্রার সূচনাবিন্দু ছিল ১৯৮১ সালের সেই একটি দিন।
ছবিটা সেই ঐতিহাসিক দিনেরই — যেখানে বাংলাদেশ ও জাপানের চিকিৎসক দল একসাথে দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়ার মুহূর্তটি ধরে রাখা হয়েছে। ছবিটি আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে ছিল না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ফারহা ভাই ছবিটি সংগ্রহ করে দেন। Faroha Suhrawardy । ফারহা ভাইয়ের কাছে পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আজ যখন এই পুরনো ছবিটার দিকে তাকাই, বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে — গর্বে ও স্মৃতিতে !! এই ছবিটা তাই শুধু একটা পুরনো ছবি না — এটা একটা সাহসের দলিল, একটা স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত, আর আমাদের কাছে, আমাদের আব্বার জীবনের সবচেয়ে গর্বের একটা দিনের স্মৃতি।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।
ছবিতে আব্বা দাঁড়িয়ে আছেন সবার মাঝে মাথায় অপারেশন থিয়েটারের সবুজ ক্যাপ ও গলায় মাস্ক পরিহিত অবস্থায় !!
বিঃ লেখক চিকিৎসকের সন্তান। তার সাস্যাল মিডিয়া পেইজ থেকে সংগৃহীত।