মীর জা‌হিদ ::

স্মৃতিপটে অস্পষ্ট কুষ্টিয়ার ‘রূপবান’: রূপালী পর্দার প্রথম তারাটিকে আমরাই কি আঁধারে ঠেলে দিলাম?

​কুষ্টিয়া—শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির এমন এক মায়াবী জনপদ, যার প্রতিটি ধূলিকণায় সুর আর রূপকের গল্প গাঁথা। এই মাটিতে গুণী মানুষের অভাব কোনোকালেই ছিল না। লালনের একতারা থেকে শুরু করে গান, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দা—কুষ্টিয়ার সন্তানেরা বরাবরই জাতীয় মেধা ও সংস্কৃতির ক্যানভাসকে পূর্ণতা দিয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মহিমায় ভাস্বর, প্রত্যেকেই আমাদের কুষ্টিয়ার গর্ব।

​কিন্তু কখনো কি আমরা নিজেদের অজান্তেই কোনো এক প্রদীপ্ত মহীরুহকে ছায়া থেকে একেবারে অন্ধকারে ঠেলে দিই না?

​তেমনি এক নীরব বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছেন আমাদের পদ্মাপাড়ের মেয়ে, কালজয়ী চিত্রনায়িকা সুজাতা (পারিবারিক নাম তন্দ্রা মজুমদার)। ষাট-সত্তরের দশকের রূপালী পর্দায় তিনি ছিলেন সেই মিষ্টি হাসির মায়াবী মুখ, যার একটুখানি হাসিতেই মোহাবিষ্ট হতো লাখো দর্শক।
​১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট কুষ্টিয়ার এক সুসংস্কৃত পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। পিতা গিরিজানাথ মজুমদারের কোল আলো করে আসা এই ছোট্ট মেয়েটি যে একদিন গোটা বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস নতুন করে লিখবে, তা কি সেদিন কুষ্টিয়ার নদী আর বাতাস টের পেয়েছিল?

১৯৫০-এর দশকে পরিবারসহ ঢাকায় পাড়ি জমালেও, সুজাতার ধমনীতে প্রবাহিত রক্ত আর শিল্পবোধ গড়ে উঠেছিল এই উর্বর জেলাতেই।

​‘রূপবান’ এবং এক অবিনশ্বর ইতিহাস;
​১৯৬৫ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেক্ষাগৃহে তখন উর্দু সিনেমার একচ্ছত্র আধিপত্য। বাংলা সিনেমা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় চরম অস্তিত্ব সংকটে। ঠিক তখনই সালাহ্‌উদ্দিন নির্দেশিত লোককাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘রূপবান’ মুক্তি পায়। মাত্র ১৭-১৮ বছরের মিষ্টি হাসির সেই তরুণী সুজাতা যখন ১২ বছরের ‘রূপবান’ চরিত্রে অভিনয় করলেন, তখন ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়েছিল।
​
টানা এক বছর (৫২ সপ্তাহ) ধরে সিনেমাটি তৎকালীন সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শিত হয়ে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিল, যা আজ অবধি আমাদের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মিল-কারখানার শ্রমিক, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, গ্রামীণ নারী-পুরুষ এমনকি দূরের গ্রাম থেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে বা গরু-মহিষের গাড়ি ভাড়া করে মানুষ হলে এসে ভিড় জমাতেন। ‘রূপবান’ হয়ে উঠেছিল তৎকালীন বাংলার এক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গণজাগরণ।
​
​পরবর্তী চার দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে সুজাতা ৩০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে ফোক ও লোকালয় ঘরানার ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ডাক বাবু, জরিনা সুন্দরী, কাঞ্চনমালা, অশ্রু দিয়ে লেখা, অবুঝ মন, বেদের মেয়ে, সাত ভাই চম্পার মতো একের পর এক কালজয়ী সিনেমা তাঁর অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি ‘অর্পণ’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেন এবং জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ।

​বাংলা চলচ্চিত্রে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা:
*​একুশে পদক (২০২১): শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।

*​*জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (আজীবন সম্মাননা): চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য লাভ করেন চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ ‘আজীবন সম্মাননা’।
​এছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) সহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

​এক না-বলা অভিমান ও আত্মবিস্মৃতির অন্তর্দাহ:i
​সুজাতা কি কখনো তাঁর নিজের জন্মমাটি কুষ্টিয়ায় ফিরে এসেছিলেন? তা আমার জানা নেই। আর যদি না-ও এসে থাকেন, তবে কিসের এই প্রচ্ছন্ন দূরত্ব? কোনো নীরব অভিমান কি তাঁকে পদ্মাপাড়ের এই চেনা মাটিতে পা রাখতে দেয়নি? নাকি নিজের মাটির মানুষের উদাসীনতা ও বিস্মৃতিই তাঁর হৃদয়ে এক না-বলা বিষাদ তৈরি করেছিল?
​তিনি নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আবেগপ্লুত হয়ে বলেছেন—কীভাবে রূপবান মুক্তির পর রাস্তায় বের হলে মানুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত, কীভাবে হলের ভেতরে দর্শকেরা কান্নায় ভেঙে পড়ত। অথচ চরম আক্ষেপের বিষয় হলো, যে কুষ্টিয়া নিজেকে ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ বলে গৌরব বোধ করে, সেই জন্মমাটিতে আজ এই কিংবদন্তিকে নিয়ে কোনো স্মৃতিচর্চা বা শ্রদ্ধার্ঘ্য নেই!
​এটি আমাদের এক গভীর ও লজ্জাজনক আত্মবিস্মৃতি।
​
একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি কতটা মহীয়ান ও সমৃদ্ধ হলে রূপালী পর্দার প্রথম সেই ইতিহাসস্রষ্টা মহাতারকাকে জন্ম দিতে পারে! অথচ আজ কুষ্টিয়ার তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশই জানে না যে কালজয়ী ‘রূপবান’ প্রকৃতপক্ষে তাঁদেরই মাটির সন্তান। শহরের কোনো কোণে নেই তাঁর একটি স্মারক বা স্মৃতিতর্পণ।

​জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রবীণ ও মিষ্টি হাসির গুণী মানুষকে তাঁর বেঁচে থাকতেই ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। কারণ, নিজের শেকড়কে ভুলে গিয়ে কোনো জনপদ কখনো পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের দাবিদার হতে পারে না।
​— কুষ্টিয়ার কালজয়ী কন্যা সুজাতার প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিনম্র অনুশোচনা।
# লেখ‌কের সোশ‌্যাল মি‌ডিয়ার ২৮/০৯/২০২৬ থে‌কে সংগৃহীত
​#Sujata #ActressSujata #Rupban #Kushtia #CulturalCapital #KushtiaCulture #BanglaCinema #EkusheyPadak #LegendaryActress #HeritageOfKushtia #কুষ্টিয়া #সুজাতা #রূপবান #বাংলাসিনেমা #স্মৃতিরকুষ্টিয়া