নিজস্ব প্রতি‌বেদক ::

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র এই আধ্যাত্মিক বানীর শ্লোগানে ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে তিন দিন ব্যপী ঐতিহাসিক লালন উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার বিকেল ৪ টায় এই স্মরণ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বিগত দিনে লালনকে তেমন ভাবে তুলে ধরা হয়নি। মহাত্মা লালন শুধু কুষ্টিয়ার সম্পদ নয়, তিনি বিশ্বব্যাপী। তাঁর অসামান্য গানে রয়েছে মানবতার মুক্তির দর্শন। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে –ছিটিয়ে রয়েছে হাজার হাজার তাঁর ভক্ত অনুসারী। তাই লালনের জীবন দর্শনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, কুষ্টিয়া এক দিন সত্যিকারের লালন নগরীতে পরিণত হবে এবং এখানে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে। গড়াই ও মধুমতি নদীতে আবারও যেন নৌকা চলাচল করতে পারে, সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পরিশেষে তিনি বাউল সম্রাট লালনের ১৩৬ তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত লালন আঁখড়াবীতে তিনদিন ব্যাপী উৎসবের উদ্ধোধন ঘোষণা করেন। আলোচনা সভায় গেষ্ট অব অনার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চান, ফকির লালন সাঁইয়ের শিক্ষা স্কুলেও পৌঁছে যাক। তিনি আরও বলেন, তিন-চার সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এসে জানতে চান, লালন উদ্যাপনে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্কুলভিত্তিক কোনো কর্মসূচি আছে কি না এবং স্কুলের শিশুরা কীভাবে লালন সম্পর্কে জানতে পারবে, তা-ও জানতে চান তিনি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চান, লালনের শিক্ষা স্কুলেও পৌঁছে যাক।
বর্তমান সরকার লালনের দর্শনে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সেই ব্যাখ্যা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, লালনের যে দর্শন, তা বর্তমান বিশ্বের জন্য অত্যন্ত জরুরী। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে নানা রকম পরিচয়বাদী সংঘাত তৈরি হয়েছে সাদা-কালো, মুসলিম-হিন্দু কিংবা ইহুদি-মুসলিম ভেদাভেদ নিয়ে মানুষ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে লালনের দর্শন অত্যন্ত অনন্য। তিনি আরও বলেন, লালন সাঁই প্রায় ১১৫-১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন এবং তার তিরোধানের পর ১৩৬ বছর পার হয়ে গেছে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি জাতি, ধর্ম, লিঙ্গসহ যে কোনো ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে কথা বলেছিলেন। বর্তমানে পৃথিবী যে কারণে অশান্ত হয়ে উঠছে, লালনের ভাবাদর্শ ঠিক সেখানেই কাজ করতে পারে। কেবল বিশ্বেই নয়, বাংলাদেশের মাটিতেও এ ধরনের পরিচয়বাদী রাজনীতি ও সংঘাত সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এসব বিভেদের রাজনীতি রুখতে লালনের দর্শন অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় গেষ্ট অব অনার ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবদ্ধিক প্রফেসর ড. রশিদুন নবী। এছাড়াও আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, পুলিশ সুপার মোঃ আমিনুল ইসলাম প্রমূখ। আলোচনা শেষে মূলমঞ্চে একাডেমির শিল্পী ও দেশবরন্য লালন শিল্পিরা লালন ফকিরের আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করেন।
সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় লালন একাডেমি লালনের এই তিরোধান দিবস অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। প্রতিবারের মত এবারও আধ্যাত্বিক গুরু ফকির লালনকে স্মরণ ও তার দর্শন পাওয়াসহ অচেনাকে চেনা, জ্ঞাণ সঞ্চয়, আত্মার শুদ্ধি ও মুক্তির লক্ষে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার লালন অনুসারী, ভক্ত অনুরাগী আর দর্শনার্থীরা আখড়াবাড়িতে এসে জড়ো হয়েছেন। সাধু বাউলদের গানে গানে প্রকম্পিত হচ্ছে আখড়াবাড়ী। খন্ড খন্ড আস্তানায় চলছে লালন ভক্ত অনুরাগীদের মিলন মেলা।
অন্যদিকে, আখড়াবাড়ী চত্বরে কালী নদীর তীরে মাঠে বসেছে বিশাল লালন মেলা। আর এই উৎসবকে নির্বিঘœ করতে সিসি টিভি, ওয়াচ টাওয়ারসহ কয়েকস্তরের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্ত্বা ব্যবস্থা গ্রহন করেছে প্রশাসন। ঐতিহাসিক এই লালন উৎসব শেষ হবে আগামী সোমবার রাতে।
উল্লেখ্য, যৌবনকালে পুণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে কালিগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার হয়ে মলম শাহ’র আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরি লাভ করেন। ভক্ত মলম শাহের দানকৃত ১৬ বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধন-ভোজনের জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। সেই ঘরেই তার সাধন-ভজন বসতো। ছেঁউড়িয়ার আখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন তিনি। ফকির লালন সাঁই প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এই মরমি সাধক বাউল সম্রাট দেহত্যাগ করেন এবং তার সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়। উপমহাদেশের আধ্যাতিক সাধক পুরুষ বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মৃত্যুর পর প্রথমে তার অনুসারীরা পরে লালন একাডেমী ও জেলা প্রশাসন যৌথভা‌বে প্রতিবছর এই তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে।