অমিতাভ কাঞ্চন ::
ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের ভারে গত ৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট সুদের আয় নেতিবাচক ধারায় নেমে এসেছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয়, বিশেষ করে সরকারি বন্ডের ওপরই ব্যাংকগুলোর মূল আয় আসছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৭টি ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে বিতরণকৃত ঋণ থেকে যে সুদ পেয়েছে, তারচেয়ে ৫ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বেশি সুদ দিয়েছে আমানতের বিপরীতে।
গত বছরের একই সময়ে ঋণের সুদ আদায় আমানতের বিপরীতে দেওয়া সুদের চেয়ে ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা বেশি।
ব্যাংকখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ দেওয়া যেহেতু ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসা, তাই সুদের আয়ই হওয়া উচিত তাদের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বেসরকারিখাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ অনেক ব্যাংকের আয়ের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে।
তারা জানান, ঋণ বিতরণ কম হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন সরকারি বন্ডে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘ব্যাংকখাতের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ভয়াবহ। সুদের আয় নেতিবাচক হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলো এখন ব্যাপকভাবে সরকারি বন্ডের ওপর নির্ভর করছে
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টিরই চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে নিট সুদ আয় কমেছে। নেতিবাচক সুদ আয়ের ধারায় থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৬টি।
একই সময়ে এই ২৭টি ব্যাংকের নিট বিনিয়োগ আয় ২১ শতাংশ বেড়ে ৩২ হাজার ৬২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মুনাফাকে ছাড়িয়ে গেছে লোকসান
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুনাফায় থাকা ২০টি ব্যাংক প্রথম ৯ মাসে মোট ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অন্যদিকে অপর ৭টির মোট লোকসান ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণেই ব্যাংকগুলো লোকসানের মুখে পড়েছে। এসব ঋণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিতরণ করা হয়েছিল।
এসব ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।
আর সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনেছে ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের কারণেই মূলত বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাই ব্যাংকগুলোকে আগের ঋণ ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ঋণের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় এবং কিছু ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ থাকায় সম্মিলিত নিট সুদের আয় নেতিবাচক হয়ে পড়েছে।’
তবে বিআইবিএমের অধ্যাপক আহসান বলেন, ‘ঋণের চাহিদা কম থাকা এই সমস্যার একটি অংশমাত্র। ব্যাংকগুলো নিজেরাও অনেক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আর সরকারের ছাড় দেওয়ার নীতি ব্যাংকগুলোকে আরও ঋণ দিতে অনাগ্রহী করে তুলেছে। এটি বেশ বিপজ্জনক পরিস্থিতি।’
তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, ‘ইচ্ছামতো ঋণ দেওয়ার পর অধিকাংশ ব্যাংকই বিপদে পড়েছে। এখন তারা সতর্ক। এমন ঋণ দেওয়ার চেয়ে না দেওয়া ভালো। কারণ, ব্যাংকের দেওয়া ঋণ শেষ পর্যন্ত আসলে জনগণের টাকার গচ্চা।’
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশও নাজুক। সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে, পণ্যের দাম বেড়েছে। সবমিলিয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় পরিবেশই প্রতিকূলে রয়েছে।’
ঋণ থেকে আয় কমার পরও তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বেশি মুনাফা দেখিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিনিয়োগ থেকে বেশি আয় এবং খেলাপি ঋণ সামলাতে ‘প্রভিশনিং’ বা সঞ্চিতি সংরক্ষণ কমিয়ে দিয়েছে।
২৭ ব্যাংকের ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা মোট সঞ্চিতি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা।
মুনাফায় থাকা ২০ ব্যাংকের সঞ্চিতি কমেছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। তাদের সম্মিলিত মুনাফা বেড়েছে ২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার বেশি।
সঞ্চিতির পরিমাণ যোগ করে দেখা যায়, এসব ব্যাংকের সঞ্চিতির আগের মুনাফা প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, আগে যেখানে মুনাফা ছিল ১৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কমে তা হয়েছে ১৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
সঞ্চিতি সবচেয়ে বেশি কমেছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের—৮২৩ কোটি টাকা। অথচ, ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি লাভ করা পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ৬৭৩ কোটি টাকা বাড়লেও সঞ্চিতি কমেছে ৩৮৭ কোটি টাকা। সিটি ও প্রাইম ব্যাংকেরও ঋণের সঞ্চিতি কমেছে।
তবে বড় ব্যাংকগুলোর এই ধারার বিপরীত চিত্র দেখিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। সঞ্চিতি ৮০ শতাংশ বেড়ে ২৬৩ কোটি টাকা হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকটির মুনাফা ৩৮ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১২০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তাদের নিট সুদের আয় ৪২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা এবং নিট বিনিয়োগ আয় ২২ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে লোকসানে থাকা সাতটি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা লোকসানের বিপরীতে মাত্র ৩৭১ কোটি টাকা সঞ্চিতি রাখতে পেরেছে।
রূপালী ব্যাংক ১ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ৪ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৯ কোটি টাকা সঞ্চিতি রেখেছে। আর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক কোনো সঞ্চিতিই রাখেনি।
যোগাযোগ করা হলে ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ার কারণেই ঋণের সঞ্চিতি কমেছে।
প্রাইম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান বলেন, সম্পদের গুণগত মান উন্নত হওয়া, খেলাপি ঋণ কমে যাওয়া এবং শ্রেণীকৃত ঋণ ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ থেকে নগদ আদায় বাড়ায় তাদের ঋণ ও অগ্রিমের সঞ্চিতি কমেছে।
এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর বলেন, ‘যেসব ব্যাংকের সঞ্চিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, সেখানে কোনো ব্যাংক মুনাফা বেশি দেখানোর জন্য উইন্ডো ড্রেসিং বা তথ্য সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করেছে কি না, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত।’
বিআইবিএমের অধ্যাপক আহসান বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত এবং তাদের ছাড় দেওয়া বন্ধ করা উচিত। ঋণ পরিশোধে বাধ্য করা গেলে ব্যাংকগুলোর আত্মবিশ্বাস ফিরবে।’
একইসঙ্গে তিনি সরকারকে ব্যবসার পরিবেশকে আরও অনুকূল ও পূর্বাভাসযোগ্য করতে, আস্থা বাড়াতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর আহ্বান জানান।
কিন্ত রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত আর্থিক খাতের উন্নয়নে এ উপদেশ বা পরামর্শ কি আদৌও বাস্তবায়ণ সম্ভব ?
বিশিষ্ট সাংবাদিক অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়ক গবেষক ও সম্পাদক আরিফ হোসেন বলেন , ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে, ব্যাংকিং খাতকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।