উজ্জ্বল কুমার  ::
একটি দেশের উন্নয়ন কতটা সফল, তা শুধু তার অবকাঠামো, বড় বড় প্রকল্প কিংবা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সেই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, বিনিয়োগের পরিবেশ কতটা আস্থাপূর্ণ, আর সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ—তার ওপর। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়নের গতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সেই উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করা কঠিন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত কয়েক দশকে কৃষি, শিল্প, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ এবং বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার পরিবেশ।
উন্নয়নের দৃশ্যমানতা ও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তি
উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র সাধারণত সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নগরায়ণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু একটি অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মাধ্যমে।
ধরা যাক, একটি দেশে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে উদ্যোক্তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোগত অগ্রগতি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল অর্জিত হবে না।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বলতে শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণকে বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে মুদ্রার বিনিময় হারের পূর্বানুমানযোগ্যতা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বিনিয়োগকারীর আস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা।
অর্থনীতিতে আস্থা এমন একটি সম্পদ, যা পরিসংখ্যানে সব সময় দৃশ্যমান হয় না; কিন্তু বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে এর প্রভাব রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোচনায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। পরিবারের সঞ্চয় সংকুচিত হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সীমিত করতে হয় এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি ব্যয়, পরিবহন, প্রতিযোগিতার পরিবেশ এবং বাজারে অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা তখনই সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে, যখন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের অনিশ্চয়তা কমবে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: অর্থনীতির ভিত মজবুত করার অপরিহার্য শর্ত
একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের জন্য অর্থায়ন করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের আর্থিক প্রবাহ সচল রাখে। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কখনোই শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণে দুর্বলতা ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন করে। এর ফলে ভালো উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়েন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার তাই কেবল খেলাপি ঋণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন ঋণ বিতরণে পেশাদারিত্ব, ঋণগ্রহীতার প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন নিরীক্ষা, জবাবদিহি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীগত প্রভাবের পরিবর্তে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও পেশাগত মূল্যায়নকে ঋণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া শক্তিশালী বেসরকারি খাত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব নয়।
বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: বিনিয়োগ সুরক্ষার অপরিহার্য উপাদান
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আলোচনায় ব্যাংকিং খাত যতটা গুরুত্ব পায়, বীমা খাত অনেক সময় ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে বীমা শুধু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, নির্মাণ, পরিবহন, অবকাঠামো এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, পণ্য পরিবহনে ক্ষতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যন্ত্রপাতির আকস্মিক ক্ষতি একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সঠিক বীমা কভারেজ এসব ঝুঁকির আর্থিক প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। ফলে উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানও জামানত ও সম্পদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তা পায়।
তবে এ ক্ষেত্রে বীমা খাতের নিজস্ব সংস্কারও জরুরি। দ্রুত ও ন্যায্য দাবি নিষ্পত্তি, আর্থিক সক্ষমতা, স্বচ্ছ আন্ডাররাইটিং, পেশাদার সার্ভে, পর্যাপ্ত পুনর্বীমা সুরক্ষা এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন করতে হবে। বীমার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি না হলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পূর্বানুমানযোগ্যতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি আমদানির ওপর অনেক উৎপাদনশীল খাত নির্ভরশীল। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস।
এ অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, বিনিময় হারের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে।
বিনিয়োগকারী শুধু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেন না; তিনি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করেন। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং মুদ্রাবাজারের কার্যকর ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশকে তৈরি পোশাক খাতের সাফল্যের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একটি বা কয়েকটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বেসরকারি খাত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: কর্মসংস্থানের বিস্তৃত ভিত্তি
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও উন্নয়নের সুযোগ পান।
বাংলাদেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সেবা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। কিন্তু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব, বাজারসংযোগের সমস্যা এবং পরিচালন ব্যয় অনেক উদ্যোক্তার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে।
এখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু জামানতনির্ভর ঋণ ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, বাজার সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তার দক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
একই সঙ্গে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার সরলীকরণ, ব্যবসা নিবন্ধনের সহজ প্রক্রিয়া, ডিজিটাল সেবা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
বড় বিনিয়োগ অর্থনীতির পরিসর বাড়ায়, কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ভিত্তি বিস্তৃত করে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই উন্নয়নের সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
মানবসম্পদ উন্নয়ন: প্রবৃদ্ধিকে উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। একটি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, যখন তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়।
শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন। শিল্প, ব্যাংকিং, বীমা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রকৌশল ও সেবা খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং পেশাগত নৈতিকতার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে বাস্তব অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এখন সময়ের দাবি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি শুধু বেকারত্ব কমায় না; এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়, অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ করে এবং অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরি করে।
এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দর্শন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং আমানতকারীর আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বীমা ও আর্থিক খাতে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চতুর্থত, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীল শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সপ্তমত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের নীতিগত নেতৃত্বের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় হোক আস্থা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে
অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সাময়িক প্রবৃদ্ধি একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে পারে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দুর্বল হলে ভবিষ্যতে তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি শক্তিশালী অর্থনীতি হলো সেই অর্থনীতি, যেখানে বিনিয়োগকারী আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করেন, উদ্যোক্তা নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন, ব্যাংক উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন করে, বীমা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির সুরক্ষা দেয় এবং সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকেন।
আমাদের উন্নয়নের মূল্যায়নেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। কত বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো, তার পাশাপাশি দেখতে হবে কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হলো এবং উন্নয়নের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাল।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে পরিবর্তনকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং পরিবর্তনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সক্ষমতা অর্জন করা। সংস্কার, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের ভিত্তি হতে হবে আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং জনগণের আস্থা।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করার মতো অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যেও প্রতিফলিত হবে।
কারণ উন্নয়নের গতি একটি দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই সেই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করে। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে থাকতে হবে একটি সুদৃঢ়, সুশাসিত, উৎপাদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি।

# লেখক আর্থিক খা‌তের গ‌বেষক।