রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে শত শত ভবনের মাঝে কিছু খালি জায়গা এখনো আছে। যা প‌রি‌বে‌শের ভারসাম‌্য রক্ষার জন‌্য প্রয়োজন। সে কার‌ণেই গুলশান-২-এর ৫৫ নম্বর সড়কে। জমির পরিমাণ ১১৪ কাঠা।

গাছগাছালিতে ভরা জায়গাটি ঢাকা ওয়াসার। পুর‌বে‌শের ভারসাম‌্য রক্ষার এ জমিতে বেসরকারি একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত অভিজাত শ্রেণির আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বলেছে, ভবন নির্মাণের পর ৫১ শতাংশের মালিক হবে ঢাকা ওয়াসা, ৪৯ শতাংশ নেবে তারা।

ঢাকা ওয়াসা প্রস্তাবটি বিবেচনায় নিয়েছে। জমির মালিকানা, বর্তমান ব্যবহার, প্রস্তাবের সুবিধা-অসুবিধা ও আর্থিক দিক যাচাই করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক দফা সভা করে প্রস্তাবটির পক্ষে মতামত দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় প‌রি‌বে‌শের ভারসাম‌্য রক্ষার ম‌তো বড় আকারের একটি জমি বেসরকারি খাতকে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান কেন এই প্রস্তাব দিল, কেন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি ঢাকা ওয়াসায় এল, ওয়াসা কেন সেটি পর্যালোচনার জন্য কমিটি করল—এসব প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢাকা ওয়াসার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুলশানের জমিটির ওপর একটি গোষ্ঠীর চোখ পড়েছে। তারাই এই তৎপরতার নেপথ্যে।

জমিটি দিয়েছে রাজউক

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ঢাকা যখন সম্প্রসারিত হচ্ছিল, তখন (১৯৬১ সাল) গুলশান মডেল টাউন প্রকল্প নেয় তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)। ডিআইটি ১৯৮৭ সালে রাজউকে রূপান্তরিত হয়।

রাজউক গুলশানে বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থাকে জমি দিয়েছে। ঢাকা ওয়াসাকে দেওয়া হয় ১১৪ কাঠার ওই জমি। সংস্থাটিকে আরও ৩২ কাঠা জমি দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) অধিগ্রহণ করে।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান, নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তি‌নি ব‌লেন নগ‌রের ভারসাম‌্য রক্ষায় সবুজায়ন প্রয়োজন। সেই ল‌ক্ষে এই রাখা হ‌য়ে‌ছিল। কিন্তু সে‌টি‌কেও ধ্বংস করার পয়তারা শুরু হ‌য়ে‌ছে।

জমি ইজারার বিষয়ে রাজউকের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার কাগজে-কলমে চুক্তি সই হয় ২০০৯ সালে। চুক্তিতে বলা আছে, রাজউক আবাসনের উদ্দেশ্যে ২৮ হাজার ৮৪৪ টাকায় এই জমি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিয়েছে ওয়াসাকে। ইজারার সাল গণনা শুরু হবে ১৯৬৪ সাল থেকে।

ঢাকা ওয়াসার জমিটি পড়ে বনানী হয়ে গুলশান-২-এর গোলচত্বর থেকে বাঁ দিকে গেলে। এর আশপাশে রয়েছে গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদ। জমিটি গুলশান লেকের পাড়ে।

সরেজমিনে ১৯ আগস্ট দেখা যায়, খা‌লি জমিটি এখন আর ফাকা নেই ! উঁচু সীমানাপ্রাচী‌রে ঘি‌রে ফেল‌া হ‌য়ে‌ছে। ভেতরে বড় বড় গাছ। আছে ইট বসানো হাঁটার পথ। এক পাশে আবাসিক ভবন, অন্যদিকে ডাকবাংলো এবং ঢাকা ওয়াসার স্থাপনা। সূত্র জানিয়েছে, ডাকবাংলোটি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য। আবাসিক ভবনটিতে ওয়াসার চারজন কর্মকর্তা বাস করেন।

দুটি আবাসন কোম্পানি সূত্র বলছে, গুলশানে ঢাকার ওয়াসার ওই জমির প্রতি কাঠার দাম ১০ কোটি টাকার আশপাশে। ফলে ১১৪ কাঠার দাম দাঁড়াবে ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকার মতো।

১৯ তলা ভবনের প্রস্তাব

ঢাকা ওয়াসার জমিটিতে যৌথ উদ্যোগে ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন নামের একটি বেসরকারি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এর চেয়ারম্যান মো. শেখ সাদী কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে তিনি মনোনয়ন পাননি।

সূত্র জানিয়েছে, এশিউর ডেভেলপমেন্টের প্রস্তাবে ওই জমিতে ১৯ তলা ‘আইকন ক্যাটাগরির’ আবাসিক ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট দেড় শর মতো ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুটের বেশি। পাঁচ বছরে তারা কাজটি শেষ করতে চায়।১১৪ কাঠা আয়তনের ওই জমিতে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন রয়েছে

আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুলশানে এখন ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। রাজউক গত জানুয়ারিতে গুলশানে কয়েকটি ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে দাম ধরা হয় বর্গফুটপ্রতি ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।

আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুলশানে সব ফ্ল্যাটই দামি। ‘আইকন ক্যাটাগরির’ যে ফ্ল্যাটের কথা বলা হচ্ছে, তার দাম বর্গফুট ২৫ হাজার টাকার আশপাশে দাঁড়াবে। এতে ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়াবে ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মতো। দেড় শ ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। ভবনটি নির্মাণে ৪০০ কোটি টাকার মতো ব্যয়ের কথা বলছে কোম্পানিটি।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে এশিউর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান শেখ সাদীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঢাকা ওয়াসায় বৈঠক

নথিপত্র বলছে, বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাব দেয় ৬ জুন। এরপর ১৬ জুলাই ঢাকা ওয়াসা তিন সদস্যের কমিটি করে। কমিটিকে জমির মালিকানা ও বর্তমান অবস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব, সুবিধা-অসুবিধা এবং ওয়াসা ও সরকারের স্বার্থসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করতে বলা হয়।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো ধরনের চাপের মুখে নয়, বরং ঢাকা ওয়াসার স্বার্থ বজায় রেখে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবারই ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি এবং নতুন নিয়োগ করা চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন প্রস্তাবটি নিয়ে একটি বৈঠক করে। বৈঠকে কয়েকজনের আপত্তির মুখে প্রস্তাবটি পাস করানো যায়নি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কর্মসম্পাদন কমিটিতে অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আশফাকুল নুমান। সূত্র বলছে, এই প্রস্তাবের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে তিনি রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা ওয়াসা পরিচালনার জন্য কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়। কারণ, ওয়াসার বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ২ আগস্ট ঢাকা ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. সাব্বির মোস্তফা খান।

ঢাকা ওয়াসায় সদস্য নিয়োগ চলছে। এ সময়ে কর্মসম্পাদন কমিটির আর কার্যকারিতা আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।রাজধানীর গুলশানে ঢাকা ওয়াসার এই জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে

রাজউক যা বলছে

রাজউকের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ইজারা চুক্তিতে জমিটির ভিন্ন ব্যবহার বা হস্তান্তরে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। আবার রাজউকের অনুমতি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাঁরা কিছু জানেন না। তবে তিনি আশা করছেন, শর্তসাপেক্ষে ঢাকা ওয়াসাকে যে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই শর্ত ভঙ্গ যাতে না হয়, সেদিকে সংস্থাটি খেয়াল রাখবে।

৪৭০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কী করবে ওয়াসা

এশিউর ডেভেলপমেন্ট যদি প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ পায় এবং ভবন নির্মাণ করে, তাহলে ৭৭টির মতো ফ্ল্যাট পাবে ঢাকা ওয়াসা। একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুট।

ঢাকার বেইলি রোডে মন্ত্রীদের জন্য এখন যে ভবন রয়েছে, সেখানে একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৫ হাজার বর্গফুট। এসব ফ্ল্যাটে রয়েছে চারটি বড় শয়নকক্ষ বা বেডরুম, একটি বসার ঘর বা ড্রয়িংরুম, একটি অফিস কক্ষ, একটি বিশ্রাম নেওয়ার ঘর বা লিভিং রুম, একটি খাবার ঘর, একটি রান্নাঘর ও ছয়টি শৌচাগার (টয়লেট)।

রাজধানীর ইস্কাটনে সচিবদের জন্য নির্মিত আবাসিক ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের মতো। ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা গুলশানে ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুট ফ্ল্যাটের জন্য প্রাধিকারভুক্ত নন। প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় আয়তনের ৭৭টি ফ্ল্যাট দিয়ে ঢাকা ওয়াসা কী করবে।

কেউ কেউ বলছেন, ভবন নির্মাণ করতে চাইলে ওয়াসাই সেটা করতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মালিকানা দেওয়া কেন?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গুলশানের মতো এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড়, খোলামেলা ও সবুজ একটি জমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে বহুতল আবাসনের জন্য বিবেচনা করাটাই প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আরও বলেন, সরকারি সম্পদ কারও ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির মাধ্যম হতে পারে না। এ ধরনের উদ্যোগের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করেছে, সেটি স্বচ্ছভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

ফ্রেন্ডশীপ বাংলা‌দে‌শের নির্বাহী প‌রিচালক আরিফ হো‌সেন ব‌লেন, নগ‌রের ভারসাম‌্য রক্ষায় খোলা জায়গার প্রয়োজন। ঢাকার অ‌ধিকাংশ এলাকায় যা অপ্রতুল। গুলশা‌নের ম‌তো অ‌ভিজাত আবা‌সিক এলাকার এই সু‌বিধা‌টি ধ্বংস করা সমু‌চিত তবে না।

তি‌নি ব‌লেন, কা‌রো ব‌্যবসা‌য়িক সু‌বিধা দি‌তে গি‌য়ে আমরা যেন নগরীর প্রাকৃ‌তিক ভারসাম‌্য ধ্বংস ক‌রে না ফে‌লি। বিষয়‌টি  নিশ্চয় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বি‌বেচনা কর‌বেন।