বিনোদন প্রতিবেদক ::
বাঙ্গালিরা পারেও বটে: একটি আন্তর্জাতিক মানের ছবি The Difficult Bride পাঁচটি দেশের সম্মিলিত প্রডাকশন। আর যখন ছবিটি ৮৩ তম ভেনিস আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরিদের স্পেশাল পুরস্কার পায় তখনো বেশিরভাগ বাঙ্গালীরা তার সমালোচনায় ব্যস্ত, আর হয়তো জানেইনা যে ছবির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন (সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন) কে ও তার শিল্পী প্রতিভার কদর কতটুকু!
আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক এবং গবেষক
রুবাইয়াত হোসেন:
জন্ম ১৯৮১ সালে, ঢাকায়।
পেশা চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক।
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবি:
মেহেরজান, আন্ডার কনস্ট্রাকশন, মেড ইন বাংলাদেশ।
তাঁর দাম্পত্য সঙ্গী আশিক মোস্তফা,
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত মেহেরজান চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে।
আর এটিও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে।
তার দ্বিতীয় ছবি আন্ডার কন্সট্রাকশন সমকালীন ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত এক নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের চিত্র। ২০১৫ সালে সিয়াটল চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর জানুয়ারি ২১, ২০১৬ বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি পায়।
তার সাম্প্রতিক ছবি, শিমু (আন্তর্জাতিক টাইটেলঃ মেড ইন বাংলাদেশ) টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ প্রিমিয়ারের পর একই বছরের ডিসেম্বরে ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ডেনমার্কে ৭০টির অধিক সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ২০২০ সালের শুরুতে কানাডা, আমেরিকা ও পরবর্তীতে মেক্সিকো, চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, জার্মানী ও জাপান সহ অন্যান্য দেশে ছবিটি বাণিজ্যকভাবে মুক্তি পায়। শিমু চলচ্চিত্রটির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন রুবাইয়াত হোসেন।
আর অতি সম্প্রতি তার আলোচিত ছবি The Difficult Bride যেটা নিয়ে তিনি ভেনিস আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে এসেছেন।
পরিচালকের ব্যক্তিগত জীবনি:
রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল হোসেন (প্রাক্তন সেতুমন্ত্রী) ও তার স্ত্রী খাজা নার্গিস হোসেনের মেয়ে।
জুন ২০০৮ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আশিক মোস্তফার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ।
সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াত হোসেন চলচ্চিত্রে আগ্রহী হন এবং ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রখ্যাত স্মিথ কলেজ থেকে উইমেন স্ট্যাডিজে স্নাতক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিশ স্কুল অফ আর্টস থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। সুফিবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি আধুনিকতার গঠন এবং নারীবাদ তার প্রাথমিক অগ্রহের বিষয়।
এছাড়াও তিনি আমেরিকার স্মিথ কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং সিনেমা, জেন্ডার ও সাউথ এশিয়া স্ট্যাডিজ বিষয়ে পড়ান।
এমন একজন পরিচালক (পরিচালিকা) বাংলাদেশের সন্তান আর তিনিই এবার ভেনিস আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে তাঁর নির্মিত The Difficult Bride ছবির জন্যে
ভেনিসে ঐতিহাসিক অর্জন: এটি প্রথম বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (৮৮ মিনিট) হিসেবে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ওরিজোন্তি (Orizzonti) প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত হয়ে ইতিহাস গড়েছে এবং উৎসবের স্বাধীন সমালোচক পুরস্কার ‘Premio Bisato d’Oro’ (সেরা পরিচালক) জয় করেছে।
The Difficult Bride এর কাহিনি নিয়ে ৮ বছর আগে পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন চিন্তাভাবনা শুরু করেন।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়েছে, যা চলচ্চিত্রটির দলের ভাষ্যমতে এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে কোনো বাংলাদেশী পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রথম অংশগ্রহণ।
উৎসবের ৮৩তম সংস্করণের ওরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগের জন্য নির্বাচিত চলচ্চিত্রটির দ্বিতীয় দিনের প্রদর্শনী রবিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২:১৫ মিনিটে ভেনিসের সালা দারসেনা থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় ও তার পরেও ৫ টি প্রেজেন্টেশন হয়।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’
এর কাহিনী ও ফিল্ম তৈরি প্রসঙ্গ:
পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন প্রায় দুই দশক ধরে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ধারণাটি নিয়ে কাজ করছিলেন। শৈশবে একটি বিউটি পার্লারে শোনা একটি গল্প এবং বছরের পর বছর ধরে মনে গেঁথে থাকা স্মৃতিগুলোই অবশেষে ঢাকার একটি বিউটি পার্লার, একটি বিয়ে এবং শৈশবের একটি ভয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির ভিত্তি হয়ে ওঠে।
“এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরা সৌন্দর্য বলতে আমরা কী বুঝি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চেয়েছি,” রুবাইয়াত বলেন। “আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি যে সৌন্দর্যবর্ধনের প্রক্রিয়ার গভীরে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকতে পারে। চলচ্চিত্রটি তুলে ধরেছে, কীভাবে সমাজ বিউটি পার্লারের মাধ্যমে একটি মেয়েকে এক কৃত্রিম ছাঁচে ফেলে নারী হিসেবে গড়ে তোলে।”
পরিচালক তাঁর শৈশবে বিয়েতে কনেদের কাঁদতে দেখে ভয় পাওয়ার স্মৃতিকেও চলচ্চিত্রের আখ্যানের আরেকটি স্তর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
“দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড”-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রধানত নারী-নেতৃত্বাধীন সৃজনশীল দল। আবহ সঙ্গীত রচয়িতা ছাড়া, সমস্ত বিভাগের প্রধানই নারী। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার বিজয়ী পর্তুগিজ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিওনর তেলেস সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন, অন্যদিকে ফ্রেডেরিকা আর গোমস ছিলেন প্রধান আলোকসজ্জা প্রযুক্তিবিদ। ফ্রান্সের রাফায়েল মার্টিন-হোলগার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন এবং ভারতের জোনাকি ভট্টাচার্য প্রোডাকশন ডিজাইনের তত্ত্বাবধান করেছেন।
নির্মাণ কাহিনী:
একটি নারী-নেতৃত্বাধীন দলের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে রুবাইয়াত বলেন, “এই চলচ্চিত্রটি এই ধারণাটিকে ভুল প্রমাণ করেছে যে নারীরা ভালো সিনেমা বানাতে পারে না। সাউন্ড মিক্সার এবং সাউন্ড ডিজাইনার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের টেকনিশিয়ান পর্যন্ত, তাঁদের দক্ষতা এবং কাজের গতি ছিল অসাধারণ।”
জাইনিন চৌধুরী করিম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অডিশনের মাধ্যমে এই চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি দেড় বছর ধরে এই প্রকল্পে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এটি তার অভিনয় জীবনের প্রথম কাজ হওয়া সত্ত্বেও, রুবাইয়াত তার অভিনয়ের প্রশংসা করেছে।
চলচ্চিত্রটিতে রিকিতা নোনডিন শিমু এবং সুনেরা বিনতে কামালও অভিনয় করেছেন। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে সুনেরার কোনো সংলাপ নেই এবং নির্মাণকালে রুবাইয়াত তার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেছে।
শিমুর জন্য এটি ভেনিস উৎসবে দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণ, এর আগে তিনি ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন ক্যালকাটা’ নিয়ে এতে যোগ দিয়েছিলেন। আজমেরি হক বাঁধন এবং দামির খান অতিথি শিল্পী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন।
চলচ্চিত্রটির বেশিরভাগ কলাকুশলী উৎসবের জন্য ভেনিসে গেছেন।
ফিরে আসি যা দিয়ে শুরু করেছিলাম বাঙ্গালীরা আসলেও কি শিল্পের কদর দিতে যানে? বাঁধন এই ছবির সামান্য একটি পার্শ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেটাও তিন বছর আগের কথা, কিন্তু বাঙ্গালিরা যারা স্বৈরশাসনে অভ্যস্ত হয়ে পরেছিলো তারা কিভাবে বাংলাদেশের এই বিরাট সাফল্য ভালোবাসার সাথে গ্রহন করবে? ছবিটি পাঁচটা দেশের নরওয়ে, পর্তুগাল, জার্মানি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের কো-প্রডাকশনে নির্মিত।
রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশে বিভিন্ন নারী অধিকার বিষয়ক এনজিও যেমন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও নারিপক্ষ এর জন্য কাজ করেছেন। তিনি ২০০৭ সালে ব্র্যাক স্কুল অব পাবলিক হেলথ কর্তৃক আয়োজিত লিঙ্গগত বৈষম্য ও অধিকার বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক কর্মশালার সহ-সমন্বয়কারী ছিলেন। তিনি ২০২১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
ভেনিস আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে The Difficult Bride উৎসবের স্বাধীন সমালোচক জুরি স্পেশাল পুরস্কার ‘Premio Bisato d’Oro’ (সেরা পরিচালক) জয় করেছে এটাই মুখ্য খবর হবার কথা।
#লেখক: Mir Monaz Haque, Accredited Film Festival Journalist.
#ছবি: পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন

