ডিএস মাহফুজা হোসেন মিতা ;:
৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে শান্তিনিবাস কার্যক্রম নেওয়া হয়।
সেই লক্ষ্যে অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ মানুষ অথবা আত্নীয় পরিজনহীনদের জন্য দেশের আটটি শহরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন আটটি ভবন নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নাম ‘শান্তিনিবাস’। সেখানে প্রবীণ নাগরিকদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আছে। কিন্তু কেউ থাকেন না। বেশির ভাগ ভবন নির্মানের পর থেকে প্রায় তিন বছর অযত্ন–অবহেলায় পড়ে আছে। ভবনের ভেতরে ধুলা জমে নষ্ট হচ্ছে আসবাব, কোথাও কোথাও ভবনের দেয়ালে গজিয়েছে শেওলা।
যে আট জেলায় শান্তিনিবাস করা হয়েছে তার মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীতে শুধু নারীরা থাকতে পারবেন। পুরুষদের জন্য চারটি নিবাস রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে শান্তিনিবাস কার্যক্রম নেওয়া হয়। জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সরকারি শিশু পরিবারগুলো, যাতে প্রবীণদের সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে সেখানকার শিশুদের পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাঁদের পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রবীণদের জন্য ৮টি শান্তিনিবাস নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০২০ সালের জুলাই মাসে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিনিবাস প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নানা কারণে কাজ ব্যাহত হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পাশাপাশি সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ৮২ কোটি ৬৯ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর একযোগে আটটি শান্তিনিবাসের ‘আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন’ করা হয়।
সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯। মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবীণ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
জনশুমারির বিভাগভিত্তিক হিসাবে দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩৬ লাখ ৬ হাজার ৬৬২ জন। এরপরই চট্টগ্রাম, এই বিভাগে বয়স্ক মানুষ আছেন ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭৯ জন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ২০ লাখ ৬৯ হাজার ১৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬১২ জন, রংপুরে ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭৮৯ জন, ময়মনসিংহে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ১১১ জন, বরিশালে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৩ জন এবং সিলেটে ৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৯ জন।
প্রবীণদের জন্য প্রতিবছর একটি দিবস আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হয়। সেই দিবস আজ, ১ অক্টোবর। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।
প্রবীণদের জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে ৫০ শয্যার একটি নিবাস রয়েছে, যা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে এই নিবাসে থাকতে হয় টাকার বিনিময়ে। এর বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রবীণ নিবাসের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের বাসিন্দাদেরও নিজ নিজ খরচ বহন করতে হয়।
শান্তিনিবাসে কি আছে
আটটি শান্তিনিবাস একই ধরনের নকশায় নির্মিত হয়েছে। পাঁচতলা ভিত্তির ওপর তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের আয়তন ১ হাজার ৬২১ বর্গমিটার। ভবনগুলোতে প্রবীণদের জন্য লিফট, অভ্যর্থনা কক্ষ, দর্শনার্থী কক্ষ, বসার জায়গা, শয্যাকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বিনোদনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চার কর্নার, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার, কফি কর্নারসহ আধুনিক নানা সুবিধা রাখা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন শান্তিনিবাস প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রতিটি ভবন নির্মাণে ছয় থেকে সাত কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে। আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ ছিল।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলা শান্তিনিবাস ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। এরপর আরও প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নিবাসটিকে বসবাসের উপযোগী করা হয়। পরে ভবনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম।
শান্তিনিবাস কেন চালু করা যাচ্ছে না, সে বিষয়ে আটটি জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সব জেলা থেকে একই উত্তর এসেছে, ভবন তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি। এ ছাড়া প্রতিটি নিবাস চালু করার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ দরকার, সেটিও অনুমোদন হয়নি। ৮টি নিবাস চালু হলে ২০০ জন প্রবীণ ব্যক্তির থাকার সুযোগ হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব গতকাল দুপুরে মুঠোফোনে বলেন, জনবল না থাকায় শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যায়নি। আটটি শান্তিনিবাস চালুর জন্য গত মাসে জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
বরিশাল
বরিশালের শান্তিনিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছে শহরের সাগরদী সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণে। সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের মেঝে, সিঁড়ি ও বারান্দায় ধুলার স্তর জমেছে। শরীরচর্চার সরঞ্জাম, আসবাব ও অন্যান্য উপকরণ পড়ে আছে। লিফটও চালু হয়নি। ভবনটির বিভিন্ন অংশে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট।
বরিশালের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, বিপুল ব্যয়ে ভবন নির্মাণের পর জনবলের অভাবে শান্তিনিবাস চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা ছাড়া আর কিছু নয়। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো, প্রবীণদের উপেক্ষা করার সংস্কৃতি শুধু সমাজ ও পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেও তা বিদ্যমান।
রাজশাহী
রাজশাহীর শান্তিনিবাস জেলার পবা উপজেলার বায়া এলাকায়। গত ৫ আগস্ট সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নিবাসে একটি সিনেমার শুটিং চলছে। স্থানীয় একজন পরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষে পুলিশের কার্যক্রমের (থানার ভেতরের) দৃশ্য ধারণ করছিলেন। একটি কক্ষকে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষ হিসেবে সাজানো হয়েছিল। আরেকটি বড় কক্ষে চলচ্চিত্রের কুশীলবদের বসা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ভবনের ভেতরে শরীরচর্চার যন্ত্র, উন্নত মানের তৈজসপত্র, আসবাবসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পড়ে ছিল। ভবনের অন্য কক্ষগুলোতে সেদিন তালা দেওয়া ছিল।
ভবনের সামনের ভিত্তিফলকটি এখনো রয়েছে। সেখানে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নামটি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে। ভিত্তিফলকে তারিখ লেখা আছে ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর।
রাজশাহী সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন জানান, এই শান্তিনিবাস পরিচালনার জন্য যে লোকবলের প্রয়োজন, তা নেই।
গোপালগঞ্জ
ঢাকা বিভাগের শান্তিনিবাসটি করা হয়েছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে গিয়েও অযত্ন–অবহেলার চিত্র দেখা গেছে। ব্যবহার না হওয়া কক্ষগুলো অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানায় ময়লা জমেছে, কোথাও স্যাঁতসেঁতে ভাব। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ভবনের ওপরের তলাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না।
গোপালগঞ্জ দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) শীলা সাহা বলেন, মাঝেমধ্যে ভবনের নিচতলা পরিষ্কার করা হয়।
খুলনা
খুলনার শান্তিনিবাস নগরের মহেশ্বরপাশায় সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সিঁড়ি, বারান্দা ও দেয়ালে শেওলা জমেছে, রেলিংয়ে জং ধরতে শুরু করেছে।
ভবনটির নিচতলায় রয়েছে ‘ডক্টরস রুম’। সেখানে একটি বেড (শয্যা), বেশ কয়েকটি হুইলচেয়ার, থেরাপি বেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা আছে। পাশের জিম রুমে শরীরচর্চার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও বেশ কয়েকটি বক্স পড়ে আছে। নিচতলার ডাইনিং রুমে বেশ বড় আকারের দুটি ডাইনিং টেবিল দেখা গেছে। ভবনে কিছু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ পেরিয়ে গেছে।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক খান মোতাহার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় আসবাব ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিছুটা নষ্ট হচ্ছে।
লালমনিরহাট
লালমনিরহাট শহরের কলেজ রোডের পাশে সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) ভেতরে ৩০ শতক জমির ওপর শান্তিনিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সব কটি কক্ষ বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। বিল বাকি থাকায় ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। লিফট অপারেটিং (রক্ষণাবেক্ষণ) চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্র বলছে, ৮ কোটি ১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৯ টাকায় ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে এই ভবন হস্তান্তর করেছে জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের শান্তিনিবাসটি করা হয়েছে পৌর শহরের পূর্ব প্রান্তে হাছননগর এলাকায় অবস্থিত শিশু পরিবারে। ভবনের ভেতরের আসবাব দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানির পাম্পটিও অচল।
হাছননগর এলাকার বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শান্তিনিবাসটি পৌরসভার ভেতরে হলেও পরিবেশ অনেকটা গ্রামীণ। পাশেই হাওর, গ্রাম, নিরিবিলি পরিবেশ। তাই এখানে শান্তিনিবাসের স্থান নির্ধারণ উপযুক্ত হয়েছে। তবে এভাবে ভবন পড়ে থাকার বিষয়টি দুঃখজনক।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ শহরের শম্ভুগঞ্জে সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে থাকা শান্তিনিবাসে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন কক্ষের ভেতরে পড়ে আছে বিছানা, আলমারি, টেবিলসহ প্রয়োজনীয় আসবাব। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে বৃষ্টির পানি ঢোকায় আসবাব নষ্ট হচ্ছিল। যে কারণে খাটের ওপর টেবিল ও আলমারি তুলে রাখা হয়েছে।
ময়মনসিংহ সরকারি শিশু পরিবারে ‘বড় ভাইয়া’ পদে কর্মরত মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, বৃষ্টির সময় ভবনের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। পানি বের হওয়ার সরু পাইপ ময়লা ও পাতায় আটকে যাওয়ায় কক্ষের ভেতর পানি ঢুকে আসবাব নষ্ট হচ্ছে। প্রায় সব আসবাব নষ্ট হওয়ার পথে।
ময়মনসিংহ সরকারি শিশু পরিবারে প্রায় দুই বছর ধরে থাকছে ১০ বছর বয়সী রিফাত মিয়া। তার বাড়ি ফুলপুর উপজেলার সল্পা গ্রামে। তার বাবা বছরখানেক আগে মারা গেছেন। মা বাড়িতে থাকেন। মৃত্যুর আগে তার বাবা প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হলে রিফাতের ঠাঁই হয় শিশু পরিবারে।
কথায়–কথায় রিফাত বলল, ‘এখানে বয়স্ক মানুষেরা থাকলে দাদা-নানার মতো থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো যেত, আমাদেরও ভালো লাগত।’
নোয়াখালী
নোয়াখালীর শান্তিনিবাসে বর্তমানে সরকারি শিশু পরিবারের শিশু, কিশোরী ও তরুণীরা বসবাস করছেন। ২০২৪ সালের বন্যার সময় শিশু পরিবারের জরাজীর্ণ ভবনের ভেতরে পানি ঢুকে সেটি সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে শিশু পরিবারের সদস্যরা সাময়িকভাবে শান্তিনিবাসে থাকছে বলে জানান শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক শ্যামল চন্দ্র পাল।
নোয়াখালী শান্তিনিবাসের নির্মাণকাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী ট্রান্সফরমার কক্ষ ভবনের বাইরে আলাদা হওয়ার কথা থাকলেও এটি মূল ভবনের ভেতরেই স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভবনে লিফট বসানো হলেও সেটি ব্যবহার করার আগেই অচল হয়ে পড়ে আছে।
পরিকল্পনা ছিল, ‘পাইলট’ (পরীক্ষামূলক) পর্যায়ের এই আট শান্তিনিবাসের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দেশের সব জেলায় প্রবীণদের জন্য এমন আবাস গড়ে তোলা হবে। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও শান্তিনিবাসে কোনো প্রবীণের আবাসন নিশ্চিত করা যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হয় না, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, তা–ও নিতে হয়। সেই উদ্যোগে ঘাটতি থাকলে ধরে নিতে হয়, প্রকল্প প্রণয়নকারীদের আগ্রহ ছিল শুধু টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণে। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, অনেকের পকেট ভারী হয়।
ভবন প্রস্তুত থাকলেও আটটি শান্তিনিবাসের কোনোটির জন্যই প্রয়োজনীয় জনবলকাঠামো তৈরি হয়নি। এসব ভবন দেখভাল কিংবা পরিচালনার জন্য কোনো বরাদ্দও দেওয়া হয় না।
সুনামগঞ্জের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শান্তিনিবাস সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ জন জনবল (প্রতিটি নিবাসে) দরকার হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবার জন্য সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসককে নিযোগ দিতে হবে।
লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. হাওয়া খাতুন অনানুষ্ঠানিকভাবে শান্তিনিবাস দেখভাল করছেন। তিনি ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক বরাবর একটি চিঠি দেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শান্তিনিবাস চালু না হওয়ার কারণে ভবনটি এবং এর ভেতরের বিভিন্ন আসবাবের ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হলে এলাকার প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণ হবে।
চিঠিতে উল্লেখ করা এমন বক্তব্যের সঙ্গে লালমনিরহাট সদরের আদর্শ পাড়ার সত্তরোর্ধ্ব আছিয়া খাতুনের কথার মিল পাওয়া যায়। তাঁর স্বামী প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। দুজনেই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। অবশ্য তাঁদেরও টানাটানির সংসার।
আছিয়া খাতুন বলেন, তাঁর থাকার কোনো সুব্যবস্থা নেই। কখনো ছেলের কাছে থাকেন, কখনো মেয়ের বাড়িতে যান। লালমনিরহাট শহরের প্রবীণদের জন্য শান্তিনিবাস হয়েছে, এটি তিনি শুনেছেন। নিবাসটি চালু হলে জীবনের শেষ কয়েকটা দিন সেখানেই থাকতে চান।

