চট্টগ্রাম ওয়াসায় হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা মো. তাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলায় ৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায়২৭(১) ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ধারায় খাইরুন্নেছাকেও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একই সঙ্গে দুদক আইনের ২৬(২) ধারায় এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়।
রায়ে তাজুলের ওপর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৬ টাকার ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। খাইরুন্নেছাকেও একই পরিমাণ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উভয়ের অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলায় এর আগে কোনো কারাবাস হয়ে থাকলে তা সাজার মেয়াদ থেকে বাদ দেওয়ার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোরারম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, তাজুল চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আরও দুটি মামলা রয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, তাজুল ১৯৮৯ সালে দুই হাজার টাকা বেতনে চট্টগ্রাম ওয়াসায় হেলপার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরে গাড়িচালক হন এবং পর্যায়ক্রমে তার বেতন ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তার বিরুদ্ধে সম্পদ ও আয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ ওঠে। ২০২২ সালের ৫ মার্চ তাজুল ও তার স্ত্রী খাইরুন্নেছার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, তাজুল ও তার স্ত্রী ২০০২ সালে চট্টগ্রাম নগরের রৌফাবাদ এলাকায় তিন শতক জমি কেনেন। ওই জমিতে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়, যাতে রয়েছে ১৭টি ফ্ল্যাট। দুদকের তদন্তে তাজুলের স্ত্রী খাইরুন্নেছার নামে সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তিনি গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার নামে জমি, ভবন ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ভবনটির অর্ধেক নির্মাণ ব্যয় হিসেবে ২৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। তবে দুদকের তদন্তে গণপূর্ত বিভাগের তিন উপপ্রধান প্রকৌশলীর মাধ্যমে পরিমাপ করে নির্মাণ ব্যয় ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়।
এছাড়া স্ত্রীর নামে ব্যাংকে নগদ অর্থসহ আরও ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে দুদক। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাজুলের আয়কে বৈধ দেখানোর জন্য তার স্ত্রীকে পোলট্রি খামারের আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখানো হয়েছিল; তদন্তে তার স্বতন্ত্র আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
দুদকের প্রায় তিন বছরের তদন্ত শেষে চলতি মাসের শুরুতে তাজুল ও খাইরুন্নেছার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১ জুলাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত। অভিযোগ গঠনের নথিতে দুজনের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬৫৯ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ উপার্জন, স্ত্রীর নামে জমি ও ভবনে বিনিয়োগ এবং দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯ টাকা সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। তারা অভিযোগ অস্বীকার করে বিচার দাবি করেন।
সোমবার আদালত তাদের বিরুদ্ধে রায় দেন। রায় অনুযায়ী, ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৬ টাকার ৫০ শতাংশ হিসাবেই উভয়ের ওপর ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

