আবু রাফি উদ্দিন ::
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি দিনের কথা উঠলে অনেক নায়ক-নায়িকার নামই আমাদের মনে ভেসে ওঠে। কিন্তু এমন কিছু শিল্পী ছিলেন, যাঁরা নায়ক না হয়েও পর্দায় নিজেদের উপস্থিতি দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। কুষ্টিয়ার সন্তান অভিনেতা শামসুদ্দিন কায়েস ছিলেন তেমনই একজন গুণী শিল্পী।
তাঁর পারিবারিক নাম শামসুদ্দিন কায়েস। ১৯৪০ সালের ১৬ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই মঞ্চনাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৬৩ সালে রাজশাহী বেতারে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। পরে নাট্যব্যক্তিত্ব কলিম শরাফীর হাত ধরে যুক্ত হন টেলিভিশন নাটকে। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আসাদ পরিচালিত ‘ঘূর্ণিঝড়’ চলচ্চিত্রে কবরীর বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। ছবিটি সাফল্য পাওয়ার পর ‘কুমারী মন’ ও ‘ঝড়ের পাখি’ চলচ্চিত্রেও নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
তবে কায়েস চৌধুরীর প্রকৃত অভিনয়প্রতিভার বিস্তার ঘটেছিল পার্শ্বচরিত্র ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে। কখনো রোমান্টিক নায়ক, কখনো রাগী বাবা, কখনো সৎ পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো মাতবর কিংবা খলচরিত্র—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নির্মাতা ও দর্শকদের কাছে এক নির্ভরতার নাম।
‘জয় বাংলা’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মৌ চোর’, ‘রাজদুলারী’, ‘রাই বিনোদিনী’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘লাল বেনারসি’, ‘রজনীগন্ধা’, ‘শিমুল পারুল’, ‘আঁখি মিলন’, ‘সাহেব’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘জিপসি সর্দার’, ‘সোনার তরী’, ‘পদ্মাবতী’, ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’, ‘লাইলি মজনু’, ‘গরিবের বউ’, ‘নাগ নাগিনী’, ‘রূপবান’, ‘গুনাই বিবি’, ‘চন্দ্রাবতী’ ও ‘সতী বেহুলা’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
ব্যক্তিজীবনে সাবেরা আক্তার ছবি নামের এক নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তানের নাম শিখা।
বাংলাদেশ বেতারের বিশেষ গ্রেডের নাট্যশিল্পী এবং চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও চলচ্চিত্রে জাতীয় পর্যায়ের কোনো পুরস্কার তাঁর ভাগ্যে জোটেনি—এটি নিঃসন্দেহে আক্ষেপের বিষয়। অথচ দর্শকের ভালোবাসা ও নির্মাতাদের আস্থাই ছিল তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
২০১২ সালের ২২ ডিসেম্বর এই গুণী অভিনেতা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
কায়েসের মতো শিল্পীরা হয়তো চলচ্চিত্রের পোস্টারে সব সময় বড় করে জায়গা পাননি, কিন্তু চলচ্চিত্রের গল্পে তাঁদের উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অভিনয়ের বহুমাত্রিকতায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।
কুষ্টিয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেখে গেছেন তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। সময়ের স্রোতে অনেক মুখ হারিয়ে যায়, অনেক নাম বিস্মৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত শিল্পীদের অবদান কখনো হারিয়ে যায় না।

