গাজীপুর, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : একসময়ের আদেশ চাপিয়ে দেয়া প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণকে সাথে নিয়ে সেবামুখী, সমন্বিত ও মানবিক প্রশাসনের একটি নতুন ধারা প্রবর্তনে কাজ করছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। বদলে যাওয়া প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভূমি সেবায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, ‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’ প্রমোট করা এবং পরিবেশ রক্ষায় হর্নমুক্ত গাজীপুর গড়াসহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন। যার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নতুন পথচলা:
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ প্রসঙ্গে মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশ এবং একই সাথে নতুন সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করা চ্যালেঞ্জিং। আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এমনকী মানুষের মনোজগতেও এক ধরনের অগোছালো পরিবেশ ছিল।’
বিগত ১৬-১৭ বছরে প্রশাসন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন বলতে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী; সবকিছু সম্পর্কেই মানুষের ধারণা হয়েছিল যে এগুলো আইন ও নিয়মনীতি অনুযায়ী চলছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইন অমান্য করা বা ‘মব’ তৈরি করে দাবি আদায়ের এক ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।’
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরুতেই মানুষের মন ও মনোজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। জনগণকে বার্তা দিয়েছি- আগের মতো শুধু ‘মারো, ধরো, কাটো’ বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার প্রশাসন এখন আর নেই। এখনকার কনসেপ্ট হলো ‘পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনের নিউ কনসেপ্ট’। আমরা জনগণের মনন ও চাহিদা বুঝে তাদের সাথে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। গাজীপুরের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের এই উদ্যোগে অভূতপূর্ব সাড়া ও সহযোগিতা দিয়েছেন।’
ভূমি সেবায় জিরো টলারেন্স ও আধুনিকায়ন:
ভূমি অফিসে নাগরিক হয়রানি ও দুর্নীতির দীর্ঘদিনের অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘ভূমি সেবার সাথে মানুষের আবেগ, সম্পদ ও জীবিকা জড়িত। তাই দায়িত্ব নেয়ার পরই আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি।’ সেবার মান বাড়াতে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে
তিনি জানান, অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার)-কে শো’কজ এবং পুরো অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা অপরাধ বিবেচনায় গণ-সাসপেন্ড করা হয়েছে।
আমরা শুধু শাস্তি নয়, সেবা সহজ করতে কর্মচারীদের কাজে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছি।
পাশাপাশি, সেবাগ্রহীতারা অফিসে না এসেও যেন সেবা পায়, সে জন্য অনলাইন পর্চা ও অ্যাপের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত বা ভ্রমণরত অবস্থাতেও খাজনা দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘শতভাগ সফল হয়েছি বলব না, তবে আমাদের চেষ্টা শতভাগ আছে। এখন অনেকেই ফোন করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন যে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের কারণে তাদের দীর্ঘদিনের আটকে থাকা কাজ কয়েক দিনেই সম্পন্ন হয়েছে।’
প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা ও মানবিক কর্মপরিবেশ:
প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে জেলা প্রশাসন কঠোর পরিশ্রম করছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক এ প্রশ্নের জবাবে বাসসকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিনেও কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরাও ওনাকে অনুসরণ করছি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেধাবী ও দক্ষ। রাষ্ট্র পরিচালনায় সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা সেরাটা দিতে প্রস্তত।’
তিনি আরও জানান, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হিসেবে গত দুই মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুক্র ও শনিবারেও মাঠে কাজ করছেন। সম্প্রতি একদিনেই জেলার প্রায় ১৩শ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৬শ’ স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে।
‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’: গাজীপুর মডেল
সমাজে শুধু অপরাধীদের দমনের পাশাপাশি ভালো মানুষদের সম্মানিত করার অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’ নামক এই উদ্যোগের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বাসস’কে বলেন, ‘আমাদের সমাজে সবসময় চোর, ডাকাত বা অপরাধীদের চিহ্নিত করার চর্চা দেখা যায়। কিন্ত সমাজে অনেক ভালো মানুষও আছেন যারা নীরবে সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছেন। আমরা যদি এই ভালো মানুষগুলোকে সামনে নিয়ে আসি, তবে অপরাধ প্রবণতা কমবে এবং অন্যরা ভালো কাজে উৎসাহিত হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’। নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত ‘প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন, এটি তারই অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পটির বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং এটিকে ‘গাজীপুর মডেল’ হিসেবে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।’
হর্নমুক্ত ও দূষণমুক্ত গাজীপুর গড়ার ১২ সপ্তাহের প্ল্যান:
শিল্পনগরী গাজীপুরকে দূষণমুক্ত করার অংশ হিসেবে ‘হর্নমুক্ত জেলা’ ঘোষণার উদ্যোগটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। এর পেছনের কারণ জানিয়ে ডিসি বাসসকে বলেন, ‘গাজীপুর শিল্প ও সবুজের এক চমৎকার সমন্বয়, কিন্ত এখানে শব্দদূষণ এক অদৃশ্য নীরব ঘাতক। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর আমরা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হর্নমুক্ত গাজীপুর গড়ার পদক্ষেপ নেই।’
এই বিষয়ে কি পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, প্রথমে নিজের গাড়ি এবং পরে সব সরকারি কর্মকর্তার গাড়িকে হর্নমুক্ত করা হয়েছে। বাইকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে এই উদ্যোগে যুক্ত করা হয়েছে। ১২ সপ্তাহের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার আওতায় শিল্প-কারখানার মালিকদের সাথে বৈঠক করে তাদের ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী গাড়িগুলোতে অহেতুক হর্ন ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস একদিনে বদলানো কঠিন, তবে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। চালকদের মধ্যে অন্তত এই বোধ তৈরি হয়েছে যে, অহেতুক হর্ন বাজানো একটি অপরাধ।’
দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা:
গাজীপুরের মূল নাগরিক সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া বাসস’কে জানান, সিটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে এসটিসি (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার সেন্টার) নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প বর্জ্যের দূষণ থামাতে ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) প্রতিষ্ঠায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে জেলা প্রশাসন।
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে জেলা প্রশাসক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রশাসনে আমরা যে আলোর বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যাচ্ছি, কর্মকর্তা বদলি হলেও এই ভালো চর্চা ও ইতিবাচক ট্রেন্ড যেন বজায় থাকে। জনগণই এই পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখবে এবং একটি সমন্বিত, সুন্দর ও সেবামুখী গাজীপুর গড়ে উঠবে।’

