আরিফ নিশির ::
শূন্য থেকে শিল্প সাম্রাজ্যের নির্মাতা ভাবা যায় !
“আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান (মজনু সাহেব) এর সংগ্রামী জীবনের গল্প” ঠিক এরকমই। যে মানুষটি নিজের ভাগ্য বদল শুধু করেননি। করেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। তিনি এমনই একজন মানুষ তিনি জনপদের ইতহাস গড়েছেন।
কিছু মানুষের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়, একটি জনপদের পুনর্জন্মের উপাখ্যান। কিছু মানুষের সংগ্রাম শুধু তাঁদের নিজের ভাগ্য বদলায় না, বদলে দেয় হাজারো মানুষের জীবন, একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, এমনকি একটি দেশের শিল্পায়নের গতিপথও। কুষ্টিয়ার মাটি এমনই একজন সন্তানের জন্ম দিয়েছিল, যাঁর নাম আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান, যিনি সবার কাছে প্রিয় মজনু সাহেব।
তাঁর জীবনের গল্প কোনো রূপকথা নয়। এটি ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করার গল্প, দারিদ্র্যকে পরাজিত করার গল্প, স্বপ্নকে বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বালিয়ে রাখার গল্প।
১৯৪৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটি হয়তো কখনো ভাবেননি, একদিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠীর নাম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করবে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেছিলেন একটি বিষয়, মানুষের সবচেয়ে বড় মূলধন অর্থ নয়, সততা, পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমানো সেই তরুণের সামনে ছিল না কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ছিল না কোনো প্রভাবশালী পরিচয় কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্যবসা। ছিল শুধু স্বপ্ন আর নিরলস পরিশ্রমের সাহস।
জীবনের এমন কঠিন সময়ও এসেছে, যখন নিজের সন্তানের জন্য এক গ্লাস দুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না। অর্থ বাঁচানোর জন্য একটি সিগারেট তিনবারে খেতে হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ হয়তো এমন বাস্তবতার কাছে হার মেনে নিতেন। কিন্তু মজনু সাহেব হার মানার মানুষ ছিলেন না। তিনি বুঝেছিলেন, অন্ধকার যত গভীরই হোক, ভোর একদিন আসবেই।
সেই বিশ্বাস থেকেই ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়ার কুমারগাড়া বিসিক শিল্পনগরীতে মাত্র ৫ হাজার টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে শুরু হয় বিআরবি ক্যাবলসের পথচলা। ছোট্ট একটি কারখানায় তৈরি হতে থাকে বৈদ্যুতিক তার। অনেকেই হয়তো তখন বিষয়টিকে সাধারণ একটি ব্যবসা হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু মজনু সাহেব দেখেছিলেন একটি স্বপ্ন, যেখানে বাংলাদেশ আর বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করবে না, বরং নিজেই শিল্প উৎপাদনের শক্তিতে দাঁড়াবে।
আজ সেই স্বপ্ন বিশাল এক বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
বিআরবি গ্রুপ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তা, অসংখ্য তরুণের কর্মসংস্থানের প্রতীক এবং কুষ্টিয়ার অর্থনৈতিক জাগরণের অন্যতম ভিত্তি। যে অঞ্চলের শিল্প একসময় ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছিল, সেই অঞ্চলেই নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়েছেন তিনি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন উদ্যোক্তার সফলতা শুধু তাঁর নিজের নয়, পুরো সমাজের।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিআরবির পণ্য পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। ব্রিটেন, জার্মানি, জাপানসহ বহু দেশে “মেড ইন বাংলাদেশ” লেখা পণ্য বাংলাদেশের সক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর অবদান অনন্য।
রাষ্ট্র তাঁর অবদানকে সম্মান জানিয়েছে। একাধিকবার সিআইপি মর্যাদা, রাষ্ট্রপতির শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার এবং জাতীয় রপ্তানি ট্রফি অর্জন তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় তাঁর পরিচয়, তিনি একজন মানুষ গড়ার কারিগর।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান সমানভাবে প্রশংসিত। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ, আধুনিক অডিটোরিয়াম এবং বিশ্বমানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত শিল্পপতি শুধু কারখানা নির্মাণ করেন না, তিনি সমাজও নির্মাণ করেন।
আজকের তরুণ সমাজ যখন দ্রুত সফলতার শর্টকাট খোঁজে, তখন মজনু সাহেবের জীবন যেন এক নীরব শিক্ষা। তিনি শিখিয়েছেন, রাতারাতি কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে না। একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকে বছরের পর বছর ঘাম, ত্যাগ, অশ্রু, ব্যর্থতা আর অবিচল ধৈর্য।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তিনটি শব্দ, নৈতিকতা, সততা এবং শৃঙ্খলা। এই তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি গড়েছেন এক শিল্প সাম্রাজ্য, যা শুধু কুষ্টিয়ার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গর্ব।
একদিন হয়তো সময় বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, নতুন নতুন শিল্পপতি আসবেন। কিন্তু ইতিহাস যখন বাংলাদেশের শিল্পায়নের গল্প লিখবে, তখন শূন্য হাতে পথচলা সেই মানুষটির নাম সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।
কারণ কিছু মানুষ শুধু ব্যবসা করেন না, তাঁরা একটি জাতির আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন।
আর আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান, আমাদের সবার প্রিয় মজনু সাহেব, তেমনই এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

