মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরা প্রতিবেদক::
এক দিকে যেমন লোনা পানির ঘেরে ভেসে বেড়াচ্ছে মাছ ও চিংড়ি অন্যদিকে,সেই ঘেরের চার পাশের উঁচু আইলে ডাল পালা মেলে ঝুলছে রসালো তরমুজ। কোনো কোনো ঘেরে তৈরি মাচায় দোল খাচ্ছে করলা, বরবটি ও শসা। জলবায়ু পরিবর্তন, মারাত্মক লবণাক্ততা আর মিঠা পানির চরম সংকটে যখন উপকূলীয় এলাকার কৃষি থমকে দাঁড়িয়েছিল,তখন সাতক্ষীরার কৃষকেরা অনাবাদি ঘেরের পাড়কে কাজে লাগিয়ে দেখিয়েছেন নতুন জীবনের পথ। অফসিজন বা অসময়ের তরমুজ চাষে উপকূলের বুক জুড়ে এখন নতুন স্বপ্নের বুনন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় প্রায় ৬৫ হেক্টর বেশি। এক সময় যা ছিল কেবল লোনা পানির পরিত্যক্ত বেড়ি, সেখানে এখন কৃষি বিভাগের সঠিক নির্দেশনা ও প্রযুক্তির স্পর্শে ফলছে বিভিন্ন জাতের ফল ও সবজি।
দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা যায়, ঘেরের পাড়ে বিস্তৃত মাচা বেঁধে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। স্থানীয়রা জানান, চৈত্র-বৈশাখ মাসে কোনো কোনো এলাকায় পানির লবণাক্ততা ১২ থেকে ১৫ পিপিটিতে গিয়ে ঠেকে। এই বৈরী পরিবেশে প্রথাগত ফসল ফলা নো অসম্ভব হলেও বিশেষ প্রযুক্তি আর উন্নত বীজ ব্যবহার করে সাফল্য মিলছে।
কৃষক নিরঞ্জন বলেন,লোনা ঘেরের আইলে ফসল হবে এমন ধারণা আগে কারো ছিল না। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে উন্নত জাতের বীজ ও পরিচর্যা পদ্ধতি প্রয়োগ করে তরমুজের পাশা পাশি করলা, বরবটি ও ঢেঁড়সের বাম্পার ফলন পেয়েছেন তাঁরা। আরেক কৃষক কৃষ্ণ মন্ডল মাছ চাষের পাশা পাশি ঘেরের পাড়ে তরমুজের আবাদ করে ইতি মধ্যেই প্রায় এক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। ক্ষেতে যে ফসল আছে, তা থেকে আরও দেড় লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সমতল জমিতে বিঘা প্রতি তরমুজ চাষে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হলেও বাজারদর ভালো থাকলে বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। বর্তমানে এলাকায় সুপ্রিম হানি, ব্ল্যাক বেবি, তৃপ্তি, সুগারকুইন ও বাংলা লিংকের মতো উচ্চ ফলনশীল জাতের আবাদ হচ্ছে। এই নতুন কৃষি বিপ্লবে যুক্ত হয়েছেন ঘরের নারীরাও। চারা রোপণ, মাচা তৈরি থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ সব খানেই তাঁদের অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় এক দিনমজুর জানান,ঘেরের আইলে তরমুজ চাষ শুরু হওয়ায় এখন প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরিতে নিয়মিত কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নেও ছড়িয়ে পড়েছে এই অসময়ের তরমুজ। বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র কৃষিবিদ নয়ন হোসেন জানান, পিকেএসএফের সহযোগিতায় তাদের প্রকল্পের আওতায় ২১ জন কৃষক ২৮ বিঘা জমিতে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে লাভ বান হচ্ছেন।
দেবহাটার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ বলেন, কুলিয়া এলাকায় প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ জন কৃষক পতিত বেড়িতে তরমুজ ফলাচ্ছেন। তবে চারা রক্ষায় বাড়তি যত্ন ও সেচের মিঠা পানির অভাব দূর করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, ২০২০ সাল থেকে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ সম্প্রসারণে কাজ করা হচ্ছে। তবে সাফল্যের পাশা পাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে টেকসই সেচ ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।উপকূলের লবণাক্ততায় ঘেরের অনাবাদি আইল গুলো যে ভাবে খাদ্য উৎপাদন ও অর্থ উপার্জনের উৎস হয়ে উঠছে, তা জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

