মীর জাহিদ ::
🔴 দশ লাখ টাকা দিয়ে তাঁরা চাকরি কিনতে চেয়েছিলেন—যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের টোপ হয়ে মৃত্যু কিনতে নয়!*
**“আমরা তো এই জীবন চাই নাই। আমরা আসছিলাম শুধু ডাল-ভাত খাইয়া বাঁচার জন্য।”**
এই আর্তনাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে কত স্বপ্নভঙ্গ, কত অসহায়ত্ব আর কত পরিবারের বুকফাটা কান্না!
যে তরুণেরা রাশিয়ায় গিয়েছিলেন, তাঁদের স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ—পরিবারের অভাব দূর করবেন, স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাবেন, বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াবেন। কেউ হয়তো সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, কেউ দেশে ফিরে ছোট্ট একটি ঘর বানাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পরিণতি যে এমন ভয়াবহ হবে, তা কি তাঁরা কল্পনা করেছিলেন?
প্রকাশিত প্রতিবেদন ও এসআরবি ( SRB) এর প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানা যায়, নির্মাণকাজে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি যুবককে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ চাকরির বদলে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। যতদূর জানা গেছে তাঁদের মধ্যে ২০ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
*** অভিযোগ অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং রুশ সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের পর তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। তাঁরা যুদ্ধের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত ছিলেন না—তবু তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এমন এক মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তই হতে পারত জীবনের শেষ মুহূর্ত।
এই যুবকদের শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে পাঠানো হয়েছে । যাতে তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার সূত্র ধরে শত্রুপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা যায়।
#কী নির্মম পরিহাস! যাঁরা বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে, তাঁদেরই জীবন অন্যের যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠল!
### আরমান আলী ও রাজন হোসেনের করুণ কাহিনি:
জামালপুরের আরমান আলীর যুদ্ধশিবির থেকে দেশে ফেরার আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। চাকরির আশায় বিদেশে গিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখোমুখি হওয়া এই তরুণের কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি পরিবারের স্বপ্ন কীভাবে মুহূর্তে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে, ঝিনাইদহের ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরীরের নিচের অংশের শক্তি হারিয়ে তিনি হাত ও বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার এগিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চার দিন খাবার তো দূরের কথা, এক ফোঁটা পানিও পাননি। পরে তিনি দেশে ফিরেছেন—কিন্তু সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শারীরিক ও মানসিক ক্ষত কতটা গভীর, তা সহজেই অনুমেয়।
### একদিকে পরিবারের কান্না, অন্যদিকে ঋণের বোঝা;
যে স্ত্রী স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, যে শিশু বাবার হাত ধরে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, যে মা ছেলের উপার্জনে শেষ বয়সে একটু স্বস্তি চেয়েছিলেন—তাঁদের জীবনে আজ নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা আর শূন্যতা।
বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ হয়তো এখনো শোধ হয়নি। প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে পরিবারগুলোকে হয়তো সেই ঋণের বোঝাও বহন করতে হবে।
আর যাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুবকদের বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।
যাতে করে আর কেউ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজের বিলাসী জীবন গড়ার লক্ষ্যে যুদ্ধের খাদ্য হিসেবে মানুষ রপ্তানি করতে না পারে।
**এই ৩০ জনই কি শেষ? আরও কত আরমান, কত রাজন, কত নাম-না-জানা তরুণের করুণ কাহিনি হয়তো অন্ধকারেই রয়ে গেছে ?**
কত মা সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় রাত জাগেন, কত স্ত্রী নীরবে চোখের জল মোছেন, কত শিশু বাবার ফেরার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে—আমরা কি কখনো তাঁদের চাপা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই?
সংবাদে হয়তো লেখা থাকে, “২০ জনের মৃত্যু।” কিন্তু ওই সংখ্যার পেছনে রয়েছে কতজনের বাবা, স্বামী, সন্তান ও ভাই। মৃত্যুর সংখ্যা গোনা যায়, কিন্তু সন্তানহারা মায়ের বুকের হাহাকার কিংবা বাবাহারা শিশুর কান্না কি কোনো সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় ?
**এই তরুণেরা বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে—প্রিয়জনদের চোখে আজীবনের কান্না হয়ে থাকতে নয়।**
**মানুষের জীবন কোনো পণ্য নয়। জীবিকার স্বপ্ন কোনো দালালচক্রের ব্যবসার উপকরণ হতে পারে না। আর কোনো আরমান যেন অসহায়ভাবে বাঁচার আকুতি জানাতে বাধ্য না হন, আর কোনো রাজন যেন জীবন বাঁচাতে যুদ্ধক্ষেত্রে বুকের ওপর ভর দিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য না হন।**
যে সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, যে শিশু বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে, “বাবা কবে আসবে?”, যে স্ত্রী শোকের মধ্যেও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন—তাঁদের এই হারিয়ে যাওয়া সুখের দায় কে নেবে ?
বিঃ দ্রঃ লেখাটি মীর জাহিদের ঠেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত।

